Apr 4, 2025

ভারতে যে কারনে কৃষক আন্দোলন সূচিত হয়

আর এন এস২৪.নেট

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে প্রতি ১২ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে একজন কৃষক আত্মহত্যা করেন জীবনযুদ্ধে হেরে গিয়ে। সেই কৃষকরাই আন্দোলনের পথ বেছে নিয়ে ১৫ দিন ধরে রাজপথে অবস্থান করছেন। রাজধানী দিল্লিতে প্রবেশের মুখে তাদেরকে আটকে দেওয়ায় তারা অবস্থান কর্মসূচি, ভারত 'বনধ' পালন করছেন।
জলকামান, কাঁদানে গ্যাস, বেধড়ক লাঠিচার্জ, দিল্লির ঠান্ডা, কিছুই দমাতে পারেনি হাজার হাজার কৃষককে। রুখতে পারেনি দিল্লি অভিমুখে কৃষকদের অভিযান। তীব্র শীতের মধ্যে হাজার হাজার কৃষক খোলা আকাশের নিচে দিল্লিগামী পাঁচটি প্রবেশপথের মুখে বসে আছেন। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন শুকনো খাবার। দাবি আদায় না করে তারা বাড়ি ফিরে যাবেন না।
কৃষকদের দাবি, অবিলম্বে তিনটি নয়া কৃষি আইন বাতিল করতে হবে, সঙ্গে বিদ্যুৎ (সংশোধনী) বিল ২০২০ ও বাতিল করতে হবে।

দাবি আদায়ের লড়াই দীর্ঘ হতে পারে জেনে ছয় মাসের রসদ সঙ্গে এনেছেন কৃষকরা। প্রায় ৪০ হাজার মহিলা কৃষকও হাজির দিল্লির উপান্তে। অনেকে জমি থেকে ট্রাক্টর চালিয়েও চলে এসেছেন। দাবি আদায়ের জন্য এতোটাই মরিয়া তারা।
কৃষক সংগঠনগুলোর ডাকে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশের সর্বস্তরের কৃষক অংশ নিচ্ছেন আন্দোলনে। দেশের সকল রাজ্যের কৃষক ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। দেশ-বিদেশের সবার নজর এখন ভারতের উতুঙ্গ কৃষক আন্দোলনে।
কৃষক নেতাদের মতে, স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু ঠিক উল্টো পথে হেঁটে কৃষিকে কর্পোরেটের হাতে তুলে দিতে সরকার নয়া কৃষি আইন করেছে। করোনা মহামারিতে যখন দেশের সাতটি বুনিয়াদি শিল্প-সহ সমস্ত ক্ষেত্রে পর পর দুই ত্রৈমাসিকে মন্দা জাঁকিয়ে বসেছে, তখনও দেশের কৃষি ৩.৪ শতাংশ হারে বেড়েছে। তাই দেশের কৃষিই কর্পোরেটের নতুন লক্ষ্য। কৃষকরা লুটেরা ব্যবসায়ী, কর্পোরেটদের গ্রাস থেকে কৃষিকে বাঁচাতে চান।
আন্দোলন কতো তীব্র ও অনঢ়, তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে আন্দোলনের মাঠে কৃষকদের অনমনীয় মনোভাবে। 'ইয়ে ইনকিলাব হ্যায়, ইয়ে রেভলিউশন হ্যায়' বলে টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে পাঞ্জাবি কৃষকের প্রতিটা শব্দে প্রত্যয় ঠিকরে বের হচ্ছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, শীতের রাজধানী দিল্লিতে বিপ্লবের অকালবসন্ত নামবে কি না, তা সময় বলবে। কিন্তু দিল্লিতে এই মুহূর্তে যা ঘটছে, তা রূপকথার চেয়ে কম নয় মোটেই। দীর্ঘদিন পর এমন জমাট লড়াই দেখছে এ দেশ। তা-ও কৃষকদের নেতৃত্বে, ঋণের ফাঁসে আত্মহত্যাই যাঁদের নিয়তি বলে মেনে নিয়েছিল সরকার থেকে আমজনতা। তারাই এখন রুখে দাঁড়িয়েছেন।

আন্দোলনের তীব্রতায় দিল্লির চারপাশে একের পর এক আপাত অসম্ভব দৃশ্যের জন্ম হচ্ছে, জন্ম নিচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। বছর ছাব্বিশের নভদীপ সিংহ জলকামানের মুখ ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। দিল্লি পুলিশের বেপরোয়া লাঠির জবাবে কৃষকরা নিজেদের খাবার, পানি ভাগ করে নিচ্ছেন পুলিশ কনস্টেবলদের সঙ্গে। জিজ্ঞেস করলে বলছেন, 'ইয়ে তো সারে আপনেহি বচ্চে হ্যায়, ইন পুলিশওয়ালো কি বাপ-দাদা ভি হমারে তেরহা খেতি করতে হ্যায়।'
ছাত্রের দল দিল্লি-হরিয়ানার সিঙ্ঘু সীমান্তে অবস্থানরত কৃষকদের জন্যে স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছে, আবার সংহতি জানিয়ে স্লোগানও দিচ্ছে। বরাবরের মতোই দিল্লির গুরুদ্বারগুলো লঙ্গরখানা খুলে কৃষক নামের অন্নদাতাদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া হচ্ছে। তার সঙ্গে বেশ কিছু মসজিদও জুড়ে গিয়েছে আন্দোলনকারী কৃষকদের খাবার সরবরাহের কাজে। সবাই মিলে সুখ-দুঃখের রুটি ভাগ করে নিচ্ছেন। অথচ দিল্লিতেই কিছুদিন আগেও ধর্মের নামে দাঙ্গা-হাঙ্গামা-রক্তপাত হয়েছে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে।
  জাতপাত, ধর্ম, বর্ণে বিভক্ত দেশে এমন দৃশ্য কোনও অংশেই বিপ্লবের চেয়ে কম নয়।
শেষ ছয়-সাত বছর যেখানে এক নতুন ধরনের প্রায়-একনায়কতান্ত্রিক, জাত-পাতে বিভক্ত শাসনের উত্থান ঘটেছে, সেখানে কৃষক ঐক্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আশাবাদ জাগিয়েছে নতুন করে। বিশেষত, প্রায়-সবগুলো বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে যেখানে
  উদ্‌ভ্রান্ত, ছন্নছাড়া, সেখানে কৃষকদের লড়াই নতুন আশার আলো ছড়াচ্ছে।
প্রায় দুই মাস আগে থেকেই কৃষকরা তাদের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সরকারের তরফে নমনীয় মনোভাব না দেখানোয় আন্দোলন ক্রমশ তুঙ্গে উঠেছে। অতীতে অসংখ্য কৃষক আন্দোলন-সংগ্রামের স্মৃতি রয়েছে ভারতের ইতিহাসে। এবারের আন্দোলনের শেষ পরিণতি কেমন হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।


RELATED NEWS
ভারতে করোনা ভ্যাকসিন নেয়ার ৯ দিনের মাথায় মৃত্যু
দিল্লি হাইকোর্টের রায়:বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে দীর্ঘদিনের শারীরিক সম্পর্ক ধর্ষণ নয়
‘বিজেপি’ মমতাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে