ভূরাজনৈতিক বিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত চীন-ভারতের প্রযুক্তি খাত
আর এন এস২৪.নেট
সিএনএনের প্রতিবেদন
এ বছর ভারত ও চীনের মধ্যে ভূরাজনৈতিক তীব্র অচলাবস্থার মাঝখানে পড়ে ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিখাত। এই শোডাউন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উভয়েই। তবে চীনের প্রযুুক্তি বিষয়ক কোম্পানিগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। জুন থেকে এই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। কয়েক দশকের মধ্যে জুনে এই দুটি দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সংঘাতময় অবস্থা সৃষ্টি হয়। হিমালয়ের পাদদেশে বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর রক্তাক্ত সংঘর্ষ হয় দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে। এতে কমপক্ষে ২০ ভারতীয় সেনা সদস্য নিহত হন। তবে চীনে কতজন নিহত হয়েছেন তা এখনও জানা যায়নি।
এ অবস্থায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর একে গত ৩০ থেকে ৪০ বছরের
মধ্যে চীনের সঙ্গে ভারতের সবচেয়ে জটিল সম্পর্ক বলে অভিহিত করেছেন। ওই ঘটনার কয়েক সপ্তাহ
ও মাস পরে চীনের প্রযুক্তি বিষয়ক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্ড, আলিবাবা এবং টেনসেন্টের
অ্যাপ নিষিদ্ধ করেন ভারতীয় কর্মকর্তারা। টেলিযোগাযোগ বিষয়ক সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক হুয়াওয়েকে
ভারতের ৫জি নেটওয়ার্কে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নিধিনিষেধ দেয়া হয় বলে রিপোর্টে বলা হয়।
এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন এবং বৃটেনের অনলাইন এক্সপ্রেস। এতে বলা হয় উভয় দেশই সেপ্টেম্বরে
সেনাবাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে রাজি হয়। কিন্তু এরই মধ্যে এই বিরোধে যেসব ব্যবস্থা
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার জন্য স্বস্তি ফিরে আসেনি। বাইটড্যান্সের আন্তর্জাতিক অ্যাপ স্বল্প
সময়ের ভিডিও প্লাটফর্ম টিকটক এখনও ভারতে নিষিদ্ধ। উপরন্তু জাতীয় নিরাপত্তায় উদ্বেগের
কথা বলে গত মাসে ভারত সরকার নিষিদ্ধ করেছে আরো কয়েক ডজন চীনা অ্যাপ। এই চাপ পড়েছে উভয়
দেশের ভিতরে অবস্থিত সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোতে। ভারতে ইন্টারনেট ভিত্তিক প্রযুক্তির
ক্ষেত্র ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। এই বিশাল বাজার পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছে চীনা কোম্পানিগুলো।
এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভারত সরকারের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০১৬ সালের তুলনায় সেখানে
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্বিগুন বৃদ্ধি পেয়ে এ সংখ্যা এখন প্রায় ৭৫ কোটি। অন্যদিকে
ইন্টারনেট ভিত্তিক বাজার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এটলাস ভিপিএনের হিসাবে ২০২৫ সাল নাগাদ
ভারতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের
ভিজিটিং ফেলো শারলে ইউ বলেছেন, বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ অর্থনীতি এবং বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের দেশ ভারতে সম্ভবত
২০৫০ সাল নাগাদ সুবিধা পাবে না চীনা কোম্পানিগুলো।
এরই মধ্যে চীনা প্রযুক্তি বিষয়ক কোম্পানিগুলো তাদের লোকসানের আঁচ পাচ্ছে। জুনে যখন
টিকটক বন্ধ করা হয় তখন ভারতে এই অ্যাপ ব্যবহার করছিলেন ২০ লাখ গ্রাহক। তাদেরকে হারিয়েছে
বাইটড্যান্সের টিকটক। যুক্তরাষ্ট্রে যে পরিমাণ মানুষ টিকটক ব্যবহার করেন তাদের তুলনায়
ভারতে হারানো ওই ২০ লাখ গ্রাহক হলেন দ্বিগুন। বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান আর৩-এর
গ্রেগ পলের মতে, বেইজিংভিত্তিক এই কোম্পানিটি ভারতে কোনো অর্থ আয় করতে পারেনি। কিন্তু
তারা বাজার ধরার জন্য এবং তাদের অ্যাপের বিস্তার ঘটানোর জন্য প্রচুর অর্থ খরচ করেছে।
এখন স্থানীয়রা এই অ্যাপের নকল সংস্করণ ব্যবহার করছে।
ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক থিংকট্যাংক গেটওয়ে হাউজের মতে, বাইটড্যান্ড এবং প্রযুক্তি
বিষয়ক অন্যান্য কোম্পানির প্রয়োজন উন্নত পণ্য তৈরি করার জন্য প্রচুর ডাটা। ভারতের ইন্টারনেট
ব্যবহারকারীদের মধ্যে রয়েছে বহুত্ব। তারা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলেন। তা ছাড়া এখানে ইন্টারনেট
ডাটার দামও অনেক বেশি। এ বছরের শুরুর দিকে গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর
পিচাই এক ব্লগপোস্টে বলেছেন, ভারতে এই কোম্পানির প্রচেষ্টা আমাদেরকে গভীরভাবে বুঝতে
শিখিয়েছে যে, কিভাবে প্রযুক্তি বিভিন্ন রকম মানুষের সাহায্যে আসতে পারে।
গেটওয়ে হাউজ পরিচালক ও পরিচালনা পরিষদের সদস্য ব্লেইস ফার্নান্দেজ বলেছেন, গুগল এবং
অন্য প্রযুক্তি বিষয়ক কোম্পানির জন্য ডাটা হলো অক্সিজেনের মতো। তিনি বলেন, প্রতিযোগিতায়
টিকে থাকার জন্য অ্যাপসের জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ আপ-টু ডেট ডাটা। তিনি পূর্বাভাস
দেন যে, ভারতে ডাটার অভাবে চীনা অ্যাপগুলো বৈশ্বিক বাজারে ভাল করবে। সেন্টার ফর ইনোভেটিং
দ্য ফিউচারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ভূরাজনৈতিক ভবিষ্যতবক্তা অভিশুর প্রকাশ বলেন, বর্তমানে
বিশ্ববাজারে চীনা প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর কৌশলকে হাইজ্যাক করা হয়েছে। চীনা
কোম্পানিগুলো নতুন নতুন পণ্য প্রস্তুত করতে ভারতের ওপর নির্ভর করতো এবং পরীক্ষা করতো।
এর ফলে ওইসব পরিকল্পনা এখন ঝুঁকিতে পড়েছে। এমন সময়ে চীনা প্রযুক্তিকে যখন দূরে সরিয়ে
দেয়ার চেষ্টা করছে ভারত, তখন এই খাতের ব্যবসায় নতুন করে এক বিশৃংখল অবস্থার সৃষ্টি
হচ্ছে।
গেটওয়ে হাউজের মতে, নিজেদের পণ্যের উন্নতি করা ছাড়াও চীনা প্রযুুক্তি কোম্পানিগুলো
ভারতের প্রযুক্তিখাতে বড় রকমের বিনিয়োগ করেছে। ২০১৫ সাল থেকে তারা এ খাতে প্রায় ৪০০
কোটি ডলার খরচ করেছে। কিন্তু চীনে বিদেশি বিনিয়োগে রয়েছে কড়া নিয়মকানুন। ফলে ভারতের
বিকশিত ইন্টারনেট বাজার থেকে লাভ বা অর্থ তুলে নেয়ার
ক্ষেত্রে চীনের সক্ষমতায় টান পড়তে পারে। এপ্রিলে ভারত সরকার ইঙ্গিত করে যে, চীনের ক্রমবর্ধমান
প্রভাব কমিয়ে আনার জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছে তারা। ভারত ঘোষণা করে যে, তাদের সঙ্গে সীমান্ত
শেয়ার করে এমন দেশগুলো থেকে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগকে তারা আরো কড়াকড়ি করবে। ওয়াশিংটনভিত্তিক
থিংকট্যাংক অলব্রাইট স্টোনব্রিজ গ্রুপের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রধান সুকান্তি ঘোষের
মতে, ভারত সরকারের এই উদ্যেগ এই ইঙ্গিত দেয় যে, ভারতে চীনের বিনিয়োগ এবং সম্পদ কিভাবে
প্রবেশ করছে সে বিষয়ে আরো সতর্ক নিয়ন্ত্রণ। তিনি আরো বলেন, তাছাড়া জুনে সীমান্তে সংঘর্ষের
পর মহারাষ্ট্রে বিনিয়োগবান্ধব সরকার চীনের শীর্ষ স্থানীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এ বছরের
শুরুতে যেসব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল তা স্থগিত করেছে অথবা বাতিল করেছে। কমপক্ষে একটি
প্রযুক্তি বিষয়ক কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
এসব বিষয়ে সরাসরি জানেন এমন চারজন ব্যক্তিকে উদ্ধৃত করে গত সপ্তাহে বার্তা সংস্থা রয়টার্স
রিপোর্ট করেছে যে, ওয়ান৯৭-এর শতকরা ৩০ ভাগ শেয়ার বিক্রি করে দেয়ার কথা চিন্তা করছে
আলিবাবার সঙ্গে যুক্ত অ্যান্ট গ্রুপ। ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার
জন্য তারা এমনটা চিন্তা করছে। ওয়ান৯৭ কে দেখা হয় জনপ্রিয় ডিজিটাল মাধ্যম পেটিএম-এর
মুল কোম্পানি হিসেবে। তবে উভয় কোম্পানিই শেয়ার বিক্রির ওই কথা অস্বীকার করেছে। অ্যান্ট
গ্রুপ এক টুইটে বলেছে, রয়টার্সের ওই রিপোর্ট সত্য নয়। আবার পেটিএমও বলেছে, ওই রিপোর্ট
মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। পেটিএম-এর এক মুখপাত্র বলেছেন, আমাদের বড় কোনো শেয়ারহোল্ডারের
সঙ্গে এ যাবত এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয় নি। এমন কোন পরিকল্পনাও নেই।
ভুগতে পারে ভারতও
যখন ডিজিটাল অর্থ বিনিময় অথবা আর্থিক প্রযুক্তির বিষয় আসে, তখন অ্যান্ট গ্রুপকে সারা
বিশ্বের একটি বড় নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই যদি রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে অ্যান্ট
গ্রুপ বা চীনা অন্য প্রযুক্তি বিষয়ক কোম্পানি ভারত ছাড়ার কথা চিন্তা করে তাহলে ভারতও
প্রযুক্তির বড় এক নেতৃত্ব মিস করতে পারে। প্রকাশ বলেন, স্বল্প মেয়াদে ভারতও লোকসান
খাবে। বিশ্বে ভারতের শুরুতে কৌশলগত বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হলো টেনসেন্ট। এরই
মধ্যে মাত্র এক বছরে ভারতে ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে সিয়াওমি। তাই সুস্পষ্ট যে, ভারতের
অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালছে চীনা প্রযুক্তি বিষয়ক কোম্পানিগুলো। স্মার্টফোন
প্রস্তুতকারক সিয়াওমি ভারতের কারখানা গড়ে তোলার জন্য বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেছে।
তাতে কাজ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ভারতীয়ের। চীন বিরোধী সেন্টিমেন্ট এবং চীনা পণ্য বর্জনের
ডাকে এসব কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গেটওয়ে হাউজের ফার্নান্দেজ বলেছেন, চীনের বিনিয়োগকারীদের
সৃষ্টি করা শূন্যস্থান এরই মধ্যে পূরণ করছে অন্য প্রযুক্তি বিষয়ক কোম্পানিগুলো। তিনি
পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, ভারত এতে খুব বেশিদিন ভুগবে না।