আইন সার্জন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক :প্রয়াত
শ্রদ্ধা
জিয়াউদ্দীন চৌ: (জেড সেলিম )
দীর্ঘ ছয় দশকের আইন পেশার বর্ণাঢ্য এক জীবন। ছিলেন দলমতনির্বিশেষে সবার আইনি অভিভাবক।গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রতি আপসহীন। নির্মোহ, নির্লোভ পেশাজীবনে তিনি অকপটে সত্য উচ্চারণ করেছেন।নিজের শ্রমে-ঘামে উপার্জিত অর্থও আজীবন ব্যয় করে গেছেন মানবকল্যাণে।হাসপাতালসহ বহু দাতব্য প্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন পৃষ্ঠপোষক। দেশের বিচার অঙ্গনের সেই সর্বজন শ্রদ্ধেয় মানুষ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আর নেই (ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন)।গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন।মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।ইউরিন ও কিডনি ইনফেকশনসহ বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতার কারণে সম্প্রতি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন প্রখ্যাত এই আইনজীবী। সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক শুধু প্রতিথযশা আইনজীবীই ছিলেন না, সমাজসেবক হয়ে দেশের নানা সংকটে ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
গত ১৫ই অক্টোবর থেকে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন হাসপাতালে ভর্তি হন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। এরপর গত মঙ্গলবার কিছুটা সুস্থবোধ করলে রিলিজ নিয়ে বাসায় ফিরে যান। কিন্তু দুপুরের পরপরই ফের তাকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। রক্তশূন্যতা, ইউরিন সমস্যাসহ বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন প্রবীণ এই আইনজীবী। তিনি ডা. রিচমন্ড রোল্যান্ড গোমেজের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
১৯৩৫ সালের ২রা নভেম্বর কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে রফিক-উল হকের জন্ম। বাবা
মুমিন-উল হক পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক। তার বাল্যকাল কেটেছে কলকাতায়। পড়াশোনা করেছেন
চেতলা স্কুলে। শৈশব শুরু করে শিক্ষা জীবনের প্রায় পুরোটাই কলকাতায় কেটেছে। পারিবারিক
ঐতিহ্য থেকে ছাত্রজীবনে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন রফিক-উল হক। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র
সংসদ নির্বাচনে পর পর দু’বার জিতেছিলেন তিনি। সোশ্যাল সেক্রেটারি হয়েছিলেন। পরে পশ্চিমবঙ্গ
যুব কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। তখন ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন কেন্দ্রীয় যুব কংগ্রেসের
সভাপতি। রাজনীতির সূত্রে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বহুবার দেখা হয়েছে, সুযোগ পেয়েছেন একসঙ্গে
কাজ করার। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের বাবা মুমিন- উল হক পেশায় ডাক্তার হলেও চব্বিশ পরগনা
মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। কলকাতা শহরও তখন এর অন্তর্গত ছিল। তিনি চব্বিশ
পরগনা জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। ডাক্তারি, জমিদারি ছেড়ে গণমানুষের জন্য রাজনীতি
করতে গিয়ে নিঃস্ব হতে হয়েছিল তাকে।
কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংস্পর্শে আসেন রফিক-উল
হক। বেকার হোস্টেলে যে কক্ষে বঙ্গবন্ধু থাকতেন তার পাশের কক্ষেই থাকতেন তিনি। এরপর
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও কারমাইকেল হোস্টেলে কিছুদিন বঙ্গবন্ধুর সহচর্যে ছিলেন।
ছাত্র জীবন থেকেই অসামান্য মেধাবী ছিলেন রফিক-উল হক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার
সময় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। ক্রিমিনাল ল’তে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন তিনি।
হিন্দু ল’ নিয়ে ব্যারিস্টারি পড়েছেন। সেখানেও দ্বিতীয় হতে হয়নি তাকে। সপ্তাহান্তে খণ্ডকালীন
চাকরি করে ব্যারিস্টারি পড়ার খরচ চালিয়েছেন। স্বাভাবিক গতিতে তিন বছরে ব্যারিস্টারি
শেষ করার কথা থাকলেও মাত্র দেড় বছরের মধ্যে সবগুলো কোর্সে পাস করেছিলেন। তাকে দিয়েই
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দু ল’ পড়ানো শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রাজশাহী
ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পরীক্ষক হিসেবে তিনি কাজ করেছেন।
রফিক-উল হক ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
স্নাতক এবং ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেয়ার পর ১৯৫৮ সালে এলএলবি পাস
করেন। এরপর ১৯৬০ সালে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। ১৯৬২ সালে ঢাকা হাইকোর্টে
আইন পেশায় যুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে আপিল বিভাগে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন
রফিক-উল হক। এ ছাড়া তিনি ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল
ও বার কাউন্সিল ইলেকশন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯০ সালে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল করা হয় তাকে। তখনই তিনি পদাধিকারবলে বার কাউন্সিলের
চেয়ারম্যান হন। এসময় তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনেও প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি অ্যাটর্নি
জেনারেল হিসেবে যে সম্মানী পেতেন তার পুরোটাই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতেন। তবে অ্যাটর্নি
জেনারেল হিসেবে নিয়োগের প্রথম মাসে তিনি তার সম্মানী থেকে ১ টাকা গ্রহণ করেছিলেন বলে
জানান ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের জুনিয়র ব্যারিস্টার অনিক আর হক ও আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল
হক। তারা বলেন, ১৯৯০ সালের ৭ই এপ্রিল থেকে ১৭ই ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ
আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন স্যার। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার
প্রথম মাসে শুধু তার সম্মানী থেকে ১ টাকা নিয়েছিলেন। এ ছাড়া অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে
তার বেতনের পুরো টাকাই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দিয়ে দিতেন।
জরুরি অবস্থায় ব্যারিস্টার রফিক-উল হক কেবল আদালতেই নন, সরব হলেন মিডিয়াতেও।
জরুরি সরকারের সময়ে যা ছিল একেবারেই বিরল। হেভিওয়েট সব রাজনীতিবিদ একে একে গ্রেপ্তার
হতে থাকলেন। আইনি লড়াইয়েও তারা অসহায়। সিনিয়র আইনজীবীরা পাশে নেই। সেই কঠিন পরিস্থিতিতে
সবারই গন্তব্য পল্টনে। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের চেম্বারে। কাউকেই ফেরাননি তিনি। অকুতোভয়,
নিষ্কম্প। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে আইনি লড়াইয়ে সামিল হলেন তিনি। লড়লেন
সবার সামনে থেকে। সেকালেই বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষেও আইনি লড়াইয়ে
নেতৃত্ব দেন তিনি।
কীভাবে সম্ভব হয়েছিল অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেয়া? কী চাইতেন তিনি? রফিক-উল হক বারবারই
বলেছেন, তার আয়কর নথিতে কোনো ঘাপলা নেই। সব ছিল একেবারে পরিষ্কার। আইনের শাসন ছিল তার
জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া। এজন্য এইতো সেদিন পর্যন্ত লড়ে গেছেন তিনি। একেবারেই বিরামহীন।
কখনো এজন্য সমালোচনারও শিকার হয়েছেন। কিন্তু নিজ অবস্থানে ছিলেন অনড়, অবিচল। বলতেন,
যা হয় আইন অনুযায়ী হোক। জরুরি অবস্থার সময় তার সাফ কথা ছিল, নতুন আইনে পুরনো অপরাধের
বিচার বেআইনি। এটা সংবিধানের বরখেলাপ। আইনের শাসন থেকে মুহূর্তের বিচ্যুতিও তিনি মেনে
নিতে পারতেন না। রুল অব ল’ এর কথা জীবনে যে কতবার বলেছেন হিসাব করা দায়। কাজ করেছেন
বাংলাদেশের ইতিহাসের সব প্রধান চরিত্রের সঙ্গে। স্নেহ পেয়েছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমানের। সে সময় বেশকিছু আইনের সংস্কারে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কাজ
করেছেন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গেও।
সে সময়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ডিটেনশনের বিরুদ্ধে হেবিয়াস কর্পাস মামলা হতো
হাইকোর্টে। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বহুক্ষেত্রে নিজ থেকেই পরামর্শ দিতেন আসামিকে ছেড়ে
দেয়ার। আদালতে সরকারি স্বার্থ নয় আইনকে প্রাধান্য দিতেন তিনি।
অসীম সাহসী, তুখোড় মেধাবী এই আইনজীবী শুধু আদালত পাড়াতেই নিজের কীর্তিকে আবদ্ধ করে
রাখেননি। এখানে তিনি আর দশটা মানুষ থেকে আলাদা। এটা সত্য, বাংলাদেশের প্রায় সব ভিআইপিরই
কখনো না কখনো তিনি আইনজীবী ছিলেন। টাকা উপার্জন করেছেন দু’হাতে। কিন্তু প্রায় সব অর্থই
ব্যয় করে দিয়েছেন মানবতার সেবায়।
সমাজ ও মানবতার সেবায় তার হাত ছিল সবসময়ই উদার হস্ত।যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সমাজ-মানবতার সেবায়। ১৯৯৫ সালে রফিক-উল হক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সুবর্ণ ক্লিনিক; ঢাকা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা ছিল তার। আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ২৫টিরও বেশি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন। ঢাকার ফার্মগেটে ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের দাদার গড়া প্রতিষ্ঠান। ঢাকা শিশু হাসপাতাল গড়ে তোলায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন ব্যরিস্টার রফিক-উল হক। এই হাসপাতালের জমি বরাদ্দ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। লটারির টিকিট বিক্রি করে এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার খরচের বড় একটা অংশ সংগ্রহ করেন তিনি।এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কাছে কোনো ফি নিতেন না বলে এই হাসপাতালের জন্য আশির দশকে ৫০ লাখ টাকা অনুদান পেয়েছিলেন। শিশু হাসপাতাল ছাড়াও সুবর্ণ ক্লিনিক, আদ-দ্বীন, বারডেম, আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালসহ অনেক চিকিৎসাধর্মী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। নিজের উপার্জিত অর্থে গাজীপুরের চন্দ্রায় ১০০ শয্যার সুবর্ণ-ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন।
বাংলাদেশে ইদানীং মৃত্যুর পরপরই বড় বড় মানুষদের এক ধরনের ফেসবুক ট্রায়াল হয়ে যায়।ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের মৃত্যুর পরও একই ঘটনা ঘটেছে। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে প্রায় সব মানুষই তার জন্য শোক প্রকাশ করছেন। কামনা করছেন মাগফিরাত। এ যেন মহিমাময় মৃত্যু। সত্যিকারের এক কিংবদন্তির জন্য প্রার্থনা করছি আমরা সবাই। পরম করুণাময়ের করুণা যেন বর্ষিত হয় তার প্রতি।