Apr 4, 2025

বিখ্যাত ব্যাক্তি গড়ার কারখানা

জিয়াউদ্দীন চৌ: (জেড সেলিম )

যুক্তরাজ্যের ১৯ জন প্রধানমন্ত্রীর জন্ম দিয়েছে।সাড়া জাগানো স্পাই চরিত্র জেমসবন্ডের স্রষ্টা ইয়ান ফ্লেমিং আর গুগলে 'ইটোনিয়ান' খোঁজ করলে মুহূর্তেই মিলবে শত শত খ্যাতিমানের নাম।বিত্তবান ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানেরাই মূলত অভিজাত এই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। কি ভাবছেন?টাকা আছে-প্রভাব আছে,ভর্তি হয়েছে।নাহ!আসলে ব্যাপারটা ভিন্ন।টাকা আর প্রভাব থাকার পরও আরও অনেক কিছু করতে হয় চান্স পাওয়া স্টুডেন্টদের।হ্যা ইংল্যান্ডের সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই হচ্ছে ইটন কলেজ। কিন্তু এর পেছনের কারণ কী? ইটন কলেজের বিশেষত্বই বা কী? চলুন এসব প্রশ্নের উত্তরের পাশাপাশি ইটন কলেজের ইতিহাস সম্পর্কেও জেনে নেওয়া যাক।

শুধু মেধার জোরে প্রায় এক কোটি টাকার (এক লাখ পাউন্ড) বৃত্তি পেয়ে লন্ডনের ইটন কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সৌমিক হায়াত। চলতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১ হাজার ২০০ আবেদনের বিপরীতে মোট ১২ জন ভর্তির সুযোগ পান।

অবস্থান এবং ক্যাম্পাস

লন্ডনের বাইরে বার্কশায়ারের উইন্ডসর শহরে ইটন কলেজের অবস্থান। টেমস নদীর তীরে প্রায় ৬০০ বছরের পুরনো এই কলেজটি ইংল্যান্ডের অন্যতম বৃহৎ স্বায়ত্ত্বশাসিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৪৪০ সালে রাজা ষষ্ঠ হেনরি ইটন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন

ইটন কলেজে শুধুমাত্র ছেলেরা পড়াশোনা করতে পারেন এবং এই নিয়ম প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বলবৎ রয়েছে। বর্তমানে ইটন কলেজে প্রায় ১,৩০০ শিক্ষার্থী রয়েছে, যার মধ্যে প্রতি বছর প্রত্যেক ক্লাসে ১৪ জন করে মোট ৭০ জনকে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হয়।

যারা এই শিক্ষাবৃত্তি লাভ করেন তাদের বলা হয় কিংস স্কলারস বা কলেজার্স। যারা কিংস স্কলারস লাভ করেন তাদের ১০ থেকে ১০০ শতাংশ টিউশন ফি ছাড় দেওয়া হয়। সেই সাথে তারা কলেজের বিশেষ ছাত্রাবাসে থাকার সুযোগ পান।

এর বাইরে যে সকল ছাত্র ইটনে পড়াশোনা করেন তাদের বলা হয় 'অপিড্যান্স'। এদের সংখ্যা প্রায় ১২ শতকের অধিক। অপিড্যান্সদের অধিকাংশই ইংল্যান্ডের সম্পদশালী ও বনেদি পরিবারের সন্তান।

ইটন কলেজে মূলত ১৩ বছর বয়সী ছেলেদের ভর্তি করা হয়। ১৮ বছর বয়সে কলেজ ছেড়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৩ বছর বয়সে ইটন কলেজে পাঠ শুরু করলেও তার ৩ বছর আগে থেকেই ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়।

যারা এই কলেজে ভর্তি হতে ইচ্ছুক তাদের প্রথমে আবেদন করে অনলাইনে পরীক্ষা দিতে হয়। এরপর যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তাদের কলেজে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। মৌখিক পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হন, তাদের বাৎসরিক ৪০ হাজার পাউন্ড বা ৫০ হাজার ডলার ফি প্রদান করতে হয়। বাংলাদেশের টাকায় যা ৪০ লাখের বেশি!

ইটন কলেজে মোট ২৫টি ছাত্রাবাস রয়েছে। প্রতিটি ছাত্রবাসে ৫০ জন করে ছাত্র থাকেন। তাদের পড়াশোনার দেখভাল করার জন্য একজন করে পেশাদার গৃহশিক্ষক রয়েছেন। এছাড়া ছাত্রাবাসে বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা কর্মীদের কাজ পর্যবেক্ষণ করেন একজন চুক্তিভিত্তিক সুপারভাইজার।

ইটন কলেজের প্রত্যেক ছাত্রকে সকাল সাড়ে সাতটায় ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে ২০ মিনিটের মধ্যে ক্লাসের জন্য প্রস্তুত হতে হয়। এরপর রাত পৌনে আটটায় রাতের খাবার খাওয়ার আগে তারা মোট পাঁচটি ক্লাস করেন। তাতেই শেষ নয়। ৯:২০-এ প্রাকশয্যা প্রার্থনা করতে হয়। সবশেষে রাত সাড়ে নয়টায় সকল ছাত্র ঘুমানোর জন্য নিজ নিজ বিছানায় চলে যান।

প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা কক্ষ। প্রতি বাড়িতে একজন হাউস মাস্টার, দুজন ডেপুটি হাউস মাস্টার ও সহকারী কর্মী রয়েছে। ছাত্রাবাসে থাকা প্রত্যেক ছাত্রের জন্য ব্যক্তিগত রুম রয়েছে। এছাড়া কিছু ছাত্রাবাসে খাবার রান্না করার জন্য নিজস্ব বাবুর্চি নিয়োগ দেওয়া হয়। বাকি ছাত্রাবাসে থাকা ছাত্ররা কলেজের ডাইনিংয়ে গিয়ে খাবার খেয়ে থাকেন।

নির্ধারিত বিশাল খাবারঘরে চলে নিয়মতান্ত্রিক ভোজ। কঠোর শৃঙ্খলায় রাখা এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সংগীত চর্চাসহ যেকোনো বিষয়ে মেধা বিকাশের সুযোগ রয়েছে।

শিক্ষার্থীরা যাতে প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগাতে পারে, সেজন্য আছে সার্বক্ষণিক পরামর্শের ব্যবস্থা। এ প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ফি প্রায় ৩৬ লাখ টাকা। এটা শুধু মৌলিক খরচ। বাড়তি প্রশিক্ষণ বা সেবার জন্য গুনতে হয় অতিরিক্ত অর্থ।

২০০২ সালে প্রতিষ্ঠানটি তাদের ভর্তি নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। মেধাবীরা যাতে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য ২০ শতাংশ ‘অ্যাসিসটেড প্লেস’ বা বৃত্তিপ্রাপ্ত আসন চালু করে। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ২৭৩ জন শিক্ষার্থী গড়ে ৬৬ শতাংশ কম বেতনে পড়েছে। আর ৭৩ জন শিক্ষার্থী পড়ছে সম্পূর্ণ বিনা বেতনে।

প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘদিন ইটন কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রত্যেক দিন ঘুম থেকে উঠতে হতো ভোর পাঁচটায়। এরপর সকালের প্রার্থনা ও নাস্তা করে ছয়টার মধ্যে ক্লাসে উপস্থিত থাকতে হতো। দিনভর ক্লাস চলার ফাঁকে মাত্র এক ঘণ্টা খেলাধুলার সুযোগ দিয়ে রাত আটটায় স্কুল ছুটি হতো।

সেই সময় ইটন কলেজে বাৎসরিক ছুটি ছিল দু'বার। বড়দিন ও গ্রীষ্মের সময় তিন সপ্তাহ করে মোট ছয় সপ্তাহ ছুটি দেওয়া হতো। এছাড়া বছরের অন্য কোনো সময় ছুটি ছিল না।

এই কলেজটি মূলত ৭০ জন গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পড়াশোনার সুবিধা করে দেওয়ার জন্য রাজা ষষ্ঠ হেনরি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই কলেজে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে তারা কেমব্রিজে কিংস কলেজে পড়াশোনার সুযোগ পেতেন। কিংস কলেজও রাজা ষষ্ঠ হেনরির হাতেই প্রতিষ্ঠিত।

ইটন কলেজের ভবন ও খেলার মাঠ Image Source Universal Images Group

পাঠক্রম বহির্ভূত কার্যক্রম
স্কুলে প্রায় ৫০ টি ক্লাব, চেনাশোনা এবং সম্প্রদায় ক্রমাগতভাবে কাজ করছে। তাদের অস্তিত্ব অংশগ্রহণকারীদের আগ্রহ এবং আকাঙ্ক্ষার উপর নির্ভর করে: কিছু দ্রুত উপস্থিত হয় এবং ঠিক তত দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়, অন্যরা বহু বছর ধরে কাজ করে। প্রত্নতত্ত্ববিদ, স্থপতি, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, শিল্পী, নকশার বৃত্ত, ভূগোল এবং আইন, বাদ্যযন্ত্র দল, প্রযুক্তিগত এবং বৈজ্ঞানিক ক্লাবগুলির ক্লাবগুলি ধ্রুব সাফল্য উপভোগ করে। স্কুলটি নিয়মিত স্থানীয় সংস্থা এবং ব্যক্তিদের সহায়তার উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছাসেবীর প্রোগ্রামগুলি প্রয়োগ করে। ইটোনগুলি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে ক্লাস, বিনোদন এবং বিদেশী ভাষার পাঠ, অসুস্থ ও বয়স্কদের যত্ন নেওয়া ।
বিদেশী ভাষা অধ্যয়নরত ছেলেরা ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন এবং রাশিয়ার স্কুলগুলির সাথে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামগুলিতে অংশ নেয়। স্কুল কোয়ার এবং অর্কেস্ট্রা ইংল্যান্ড এবং বিদেশী দেশগুলিতে কনসার্ট দেয় - জার্মানি, ভারত, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, জাপান, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা। গত কয়েক বছর ধরে, ক্রীড়া দলগুলি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, হংকং, আফ্রিকান দেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতাগুলিতে ভ্রমণ করেছে। ক্লাব এবং সম্প্রদায়গুলি শখের ভ্রমণের আয়োজন করে। সাম্প্রতিক ভ্রমণে গ্রীস, ইতালি, কেনিয়া, নেপাল এবং তিব্বতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তাছাড়া কলেজের শিক্ষার্থীদের শারীরিক বিকাশের প্রতি মহা নজর দেওয়া হয়। ১।শরীরচর্চা ২।বাস্কেটবল ৩।ব্যাড্মিন্টন-খেলা ৪।কারাতে ৫।অশ্বারোহন ৬।ভলিবলখেলা ৭।ব্যায়াম ৮।দাঁড় টানা ৯।রক ক্লাইম্বিং ১০।স্কোয়াশ ১২।শুটিং ১৩।সাঁতার ১৪।পরিবেষ্টনী ১৫।ফুটবল ১৬।টেনিস এবং আরও অনেক কিছু।

ইটন কলেজটি সুসজ্জিত এবং সজ্জিত, এটিতে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণাগার, একটি নকশা ও প্রযুক্তি কেন্দ্র, ৪০০ আসনের একটি থিয়েটার, পেশাদার রেকর্ডিং স্টুডিও, ক্রীড়া ক্ষেত্র, খেলার মাঠ এবং একটি সুইমিং পুল সহ একটি স্পোর্টস কমপ্লেক্স রয়েছে। টেমসে, ছেলেরা ঘুরে বেড়াতে এবং ক্যানোয়িং করতে যায়।

ইটন কলেজ এক সাথে একাধিক সংস্থার সম্পূর্ণ সদস্য: দ্য হেডমাস্টার্স "এবং প্রধান শিক্ষক" সম্মেলন (এইচএমসি), এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা "জি ২০ স্কুল" এর পরিচালক এবং পরিচালকদের সমিতি, যা আবারও এর স্তর এবং মর্যাদাকে জোর দেয়।

বিদ্যালয়টি নিয়মিত স্বাধীন বিদ্যালয় পরিদর্শক দ্বারা পর্যালোচনা করা হয় ( আইএসআই), শেষ পর্যালোচনা ২০১০ সালে করা হয়েছিল। পরিদর্শন ফলাফলের উপর ভিত্তি করে, স্কুল গ্রেড প্রাপ্ত:

  • শিশুদের একাডেমিক সাফল্যের জন্য - "দুর্দান্ত"
  • পাঠ্যক্রমের মান এবং সংস্থার জন্য - "দুর্দান্ত"
  • বহির্মুখী শিক্ষার প্রতিষ্ঠানের জন্য - "দুর্দান্ত"
  • শিক্ষার মানের জন্য - "দুর্দান্ত"
  • শিশুদের শিক্ষা এবং উন্নয়নের স্তরের জন্য - "দুর্দান্ত"
  • শিশু যত্নের মানের জন্য - "দুর্দান্ত"
  • শর্তাদি, শিশু যত্ন এবং সুরক্ষার জন্য - "দুর্দান্ত"
  • স্কুল নেতৃত্বের মানের জন্য - "দুর্দান্ত"
  • বোর্ডিং হাউসে শিক্ষা এবং আবাসনের স্তরের জন্য - "চমৎকার"
  • পিতামাতার সাথে কাজের জন্য - "দুর্দান্ত"

একটি স্বাধীন ডিরেক্টরিতে " ভাল স্কুল গাইড"এটি স্কুল সম্পর্কে বলে:" এখন অবধি, ছেলেদের জন্য ১ নম্বর স্কুল। সরঞ্জাম এবং কর্মীরা আশ্চর্যজনক। ইটন উজ্জ্বল এবং সফল তরুণদের মর্যাদার সাথে প্রস্তুত করে এবং বাস্তবে স্কুলটি অনেক লোক যা ভাবেন তার চেয়ে অনেক আধুনিক।

দ্য সানডে টাইমস অনুসারে, কলেজটি ২০১৩ সালে ১৪ তম এবং ২০১২ সালে অষ্টম স্থানে ছিল ইউকে সেরা স্বতন্ত্র বিদ্যালয়গুলির মধ্যে এবং ২০১৩ সালে ৭ম ম এবং ২০১২ সালে তার প্রাক-ইউ পরীক্ষায় ৫মম স্থান ছিল।
স্কুলটি সমস্ত ধর্ম এবং স্বীকৃতি স্বীকার করে নিয়েছে শিশু বিদ্যালয়ের সরকারী ধর্ম হচ্ছে অ্যাংলিকানিজম।

১৯৭৮ সালে ইটন কলেজের কয়েকজন ছাত্র Image Source Evening Standard

রাজনৈতিক সাফল্যের রহস্য

২০১৬ সালে ইটন কলেজের ১১ জন ছাত্রের একটি দল রাশিয়া সফর করে। সেই সফরে তারা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে সাক্ষাতও করেন। কিন্তু তাদের এই সফরে কলেজ কিংবা ব্রিটেন সরকার, কারো কোনো সাহায্য ছিল না। বরং তারা নিজেদের প্রচেষ্টায় প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে সাক্ষাত করে আসেন।

এ থেকে ধারণা করা যায়, ইটন কলেজের ছাত্ররা নিজেদের কতটুকু দক্ষ করে গড়ে তোলেন। যেখানে বিশ্বের অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাক্ষাত পাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে কলেজ পড়ুয়া এই ছাত্রদের রুশ নেতার সাথে সাক্ষাত করা চাট্টিখানি বিষয় নয়।

কিন্তু যারা ব্রিটেনের মতো রাষ্ট্রকে পরিচালনার লক্ষ্য নিয়ে ইটন কলেজে পড়তে আসেন, তাদের এমন যোগ্যতা থাকাই আবশ্যক। ইটন কলেজ থেকে যুক্তরাজ্যের সর্বাধিক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। চলুন সেই বিষয়গুলো জেনে নেওয়া যাক।

মা ও বাবার সাথে প্রিন্স উইলিয়াম ও হ্যারি Image Source AP

রাজপরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক

ব্রিটেনের অভিজাত পরিবারের সন্তানদের পড়ার জন্য ইটন কলেজই যে প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল, তা নয়। ইটনের চেয়ে ৫২ বছর আগে উইনচেস্টার কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু সেসময় ব্রিটিশ রাজপরিবার এবং অধিকাংশ অভিজাত পরিবারের সন্তানরা বাড়িতে অথবা ছোট কোনো আশ্রমে পড়াশোনা করত।

তবে উইনচেস্টার ও ইটন কলেজের মধ্যে মূল পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠাতারা। উইনচেস্টার কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন একজন বিশপ। বিপরীতে ইটন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা হলেন রাজা ষষ্ঠ হেনরি।

রাজা হেনরি ভবিষ্যতের শাসকদের কথা বিবেচনা করে ইটন কলেজসহ আরো কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের দিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তবে উইন্ডসর প্রাসাদের একেবারেই নিকটে ইটন কলেজ। ফলে রাজপরিবারের অনেক সদস্য এই কলেজে পড়াশোনা করেছেন।

বিবিসির তথ্য বলছে, ব্রিটিশ রাজপরিবারের কমপক্ষে ১৫ জন সদস্য এই কলেজে পড়াশোনা করেছেন। এদের মধ্যে বর্তমান সময়ের প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্স হ্যারিও রয়েছেন। এছাড়া বেলজিয়াম, রোমানিয়া, ইথিওপিয়া, থাইল্যান্ড ও নেপালের রাজপরিবারের সদস্যরাও ইটনে পড়াশোনা করেছেন।

রাজপরিবারের সাথে ইটন কলেজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে এখানকার পড়ুয়ারা স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতিতে বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকেন। তবে রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি ইটন কলেজ ব্রিটেনে শিক্ষিত ও ভদ্র সমাজ সৃষ্টিতেও ভূমিকা রেখেছে। এ কারণেই ইটন কলেজকে বলা হয় 'দ্য নার্সারি অব ইংল্যান্ড'স জেন্টলম্যান'।

রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে ইটন কলেজের ছাত্রদের একটি দল Mikhail Klimentyev TASS

উচ্চাকাঙ্ক্ষা

ব্রিটেনের অভিজাত পরিবারগুলো সবসময়ই আর্থিকভাবে ইটন কলেজকে পৃষ্ঠপোষকতা করে গিয়েছে। যাতে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল হলেও উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিবারের সন্তানরা যেন এই কলেজে পড়াশোনা করতে পারেন।

এক্ষেত্রে ইটন কলেজ সফলও হয়েছে। উনিশ শতকের শুরুর দিকে স্কটল্যান্ডের মধ্যবিত্ত পরিবারের জন গ্লাডস্টোন চেয়েছিলেন তার অন্তত একজন সন্তান যেন রাজনীতিতে সফল হতে পারে। নিজের স্বপ্নকে পূরণ করার জন্য অনেকের কাছে পরামর্শ চান জন। পরবর্তীতে অক্সফোর্ডের ক্রাইস্ট চার্চ তাকে ইটন কলেজের কথা বলেন। নিজের বড় সন্তান তাকে অনেক আগেই হতাশ করেছেন। ফলে তিনি তার আরেক সন্তান উইলিয়াম গ্লাডস্টোনকে ইটন কলেজে ভর্তি করে দেন, যিনি ব্রিটেনের চারবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তার জন্ম নিউ ইয়র্কে। তার মা শার্লোট জনসনের বয়স যখন ২২ বছর, তখন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির উপর ডিগ্রি নেওয়া ছেড়ে দিয়ে স্বামীর সাথে মার্কিন মুলুকে চলে যান। তখন তার স্বামী স্ট্যানলি জনসন, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির ছাত্র।

পরবর্তীকালে বরিস জনসনের বাবা বিশ্বব্যাংকে চাকরি করলেও, তার মা চিত্রশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়েন। সেই হিসেবে তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। কিন্তু লক্ষ্য ছিল রাজনীতি করার। যেকারণে তিনি ইটন কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন।

ইটন কলেজের কোনো এক অনুষ্ঠানে প্রিন্স উইলিয়াম David M Bennet

রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ

উইলিয়াম গ্লাডস্টোনের বাবা রাজনীতি শেখার জন্য ইটন কলেজের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, অভিজাত পরিবারের সন্তানদের সাথে মেলামেশার ফলে তার সন্তান অনেক বেশি জ্ঞান আহরণ করতে সক্ষম হবে। সেই সাথে ইটন কলেজের রাজনৈতিক শিক্ষা সম্পর্কেও তার ধারণা ছিল।

ইটন কলেজে 'পপ' নামে একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতার সংগঠন রয়েছে। এই সংগঠনের মাধ্যমে গ্লাডস্টোন নিজেকে বাগ্মী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। বরিস জনসনদের সময় থেকে 'পপ' অবশ্য বিতর্ক প্রতিযোগিতার সংগঠন থেকে কিছুটা দূরে সরে গেছে। তার পরিবর্তে কলেজে সফল ছাত্রদের সংগঠনে রূপ নিয়েছে।

ইটন কলেজে পড়ার সময় গ্লাডস্টোন এক আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। যার নাম ছিল 'ক্যানিংইটস'। তাদের নেতা জর্জ ক্যানিংয়ের নামানুসারে এই নামকরণ হয়েছিল। ক্যানিং বয়সে গ্লাডস্টোনের বড় ছিলেন এবং তিনিও ইটন কলেজেই পড়াশোনা করেছেন। গ্লাডস্টোনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ক্যানিংয়ের বড় অবদান ছিল।

ক্যানিংয়ের বাবা ছিলেন একজন ব্যর্থ ওয়াইন ব্যবসায়ী এবং মা অভিনেত্রী। তাদের ছেড়ে অনেক দূরে চাচার তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠেছিলেন।

ইটন কলেজে পড়ার সময় ক্যানিং বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। জনসম্মুখে দুর্দান্ত ভাষণ দেওয়ার গুণই তাকে পরবর্তীতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসিয়েছিল।

অর্থ অথবা মেধা

ইটন কলেজে পড়ার সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে মানদণ্ড হলো দুটি। হয় পরিবারের অর্থ থাকতে হবে, অথবা পড়ুয়ার মেধা থাকতে হবে।

১৬৫৭ সালে ইটন থেকে পাশ করে উইলিয়াম শার্লক প্রথমে দ্বিতীয় জেমস ও পরে তৃতীয় উইলিয়ামের শাসনকালে রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ পাদ্রী ছিলেন; যিনি ইটনে পড়াকালে তেমন কোনো ফি পরিশোধ করেননি। কেননা বৃত্তি পেয়েছিলেন তিনি।

আবার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং প্রথম প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ওয়ালপোল বৃত্তি লাভের পরও ফি প্রদান করেছেন। কারণ তাদের পরিবারের সামর্থ্য ছিল।

বর্তমান সময়ের প্রায় ১৩ শতাধিক ছাত্রদের মধ্যে যারা বিত্তবান পরিবারের, তাদের পুরো টিউশন ফি প্রদান করতে হয়। যারা বিত্তবান পরিবারের সন্তান হয়েও বৃত্তি পেয়েছেন তাদের অনেকেই ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ফি প্রদান করেন।

তবে কোনো ছাত্রের পরিবারের পক্ষে ব্যয় বহন করা সম্ভব না হয়, তাহলে তাদের জন্য ইটন কলেজ ছাড় দিয়ে থাকে। সফল হওয়ার জন্য পরিশ্রমের পাশাপাশি অর্থ ও মেধার যেকোনো একটি হলেই যথেষ্ট। ইটন কলেজ তাদের ছাত্রদের পরিশ্রমী হিসেবে গড়ে তোলে। সেই সাথে মেধা অথবা অর্থের জোর থাকার কারণে খুব সহজেই এই কলেজের ছাত্ররা সফলতা লাভ করেন।

বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ইটন কলেজের ছাত্র ছিলেন Toby Melville

পূর্বের রাজনৈতিক সাফল্য

ব্রিটেনের রাজনীতিতে ইটন কলেজের পূর্বের সাফল্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে বিশেষ প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছেন। ইটনের শিক্ষকরা প্রধানমন্ত্রী তৈরি করার জন্য সবসময় সচেষ্ট। তারা তাদের শিক্ষার্থীদের পূর্বের প্রধানমন্ত্রীদের উদাহরণ টেনে উজ্জীবিত করে থাকেন।

বরিস জনসন তার আত্মজীবনী 'জাস্ট বরিস'-এ তার সময়কার প্রভোস্টের বিখ্যাত একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছেন,

তিনি আমাদের প্রায়ই বলতেন, আমরা ভবিষ্যতের নেতা। আমাদের কিছু দায়িত্ব ও লক্ষ্য রয়েছে, যা কখনোই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। তোমাদের পিট দ্য এল্ডারের মতো ভাবতে হবে এবং নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, আমি কী সেই মহান নেতাদের মতো করে নিজেকে গড়ে তুলছি?

ব্রিটিশ রাজনীতিতে ইটন কলেজের এই আভিজাত্য সেখানকার ছাত্রদের বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। তারা প্রায়ই সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পান এবং খুব কাছে থেকে তাদের বক্তব্য ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে পারেন, যা পরবর্তীতে তাদের সাফল্য পেতে সাহায্য করে।


RELATED NEWS
বৃটেনের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধের আহবান : আরনদ ফোন্টানেত
বৃটেনের এক বিলিয়ন ডলার অনুদান
বৃটেনে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে
বৃটেনে করোনায় মৃতদের দাফন ও কবরস্থান সংকটে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি
ভ্যাকসিন নিয়েছেন বৃটেনের রাণী
লন্ডনে মুসল্লিরা নামাজ পড়তে পারেননি
লন্ডন মেয়র সাদিক খান :করোনার ভয়াবহতাকে ‘মেজর ইনসিডেন্ট’ ঘোষণা
বৃটিশ সরকারের সতর্কতা ও নির্দেশনা
'টিয়ার ৫' লকডাউন জারি হতে পারে ইংল্যান্ডে
নতুন ধরনের করোভাইরাস সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে : আবার কঠোর লকডাউন
বৃটেনের ক্ষুধার্ত শিশুদের খাওয়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ইউনিসেফ
লন্ডনের হ্যাকনিতে প্রকাশ্যে গুলি,আহত-৩: রহস্য উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত চলছে
ভাইরাস ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে লন্ডনে শিক্ষার্থীদের করোনা পরীক্ষা হবে
হোম অফিসের গোঁপন নথি ফাঁস: আশ্রয় প্রার্থীদের দ্বীপে পাঠানোর প্রস্তাব
ইসলামী অর্থায়নে ব্রিটিশ সরকারের ব্যার্থতা
গুড বাই বরিস জনসন, কে এই বিতর্কিত জনসন
আজ থেকে লন্ডনসহ বিভিন্ন শহরে টিয়ার-২
প্রথমবারের মতো বাইরে এলেন রানী এলিজাবেথ
করোনা নিয়ন্ত্রণে বৃটেনে নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ
ব্রিটেনে তিন বছরে সর্বোচ্চে বেকারত্ব
করোনা: দ্বিতীয় সংক্রমণ বিপজ্জনক
নতুন করে তদন্ত হবে বৃটেনের এপিপিজি’র বিরুদ্ধে
নটিংহ্যামকে উচ্চ ঝুঁকির ক্যাটেগরিতে রাখা হয়েছে
৩ সপ্তাহ বিলম্বিত হবে ইংল্যান্ডে জিসিএসই, এ-লেভেল পরীক্ষার কিছু বিষয়
যু্ক্তরাজ্যে ৩ স্তরবিশিষ্ট লকডাউন ঘোষণা হতে পারে
যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ধীর হওয়ার পূর্বাভাস
শতবর্ষী দবিরুল পেলেন বৃটেনের রানীর “অর্ডার অফ দ্যা বৃটিশ এমপ্যায়ার “পদক
গবেষণা :বৃটেনে ৮০ শতাংশ উপসর্গহীন করোনয় আক্রান্ত
নিউ হোপ গ্লোবাল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর প্রকল্প নিয়ে কাজ করবে
নথি ফাঁস: বৃটেনে নভেম্বরেই ভ্যাকসিন মিলবে
বৃটেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে করোনায় আক্রান্ত আরো ১৮০০ শিক্ষার্থী
গ্রাম ও উপকূলীয় এলাকায় বাড়ি খুঁজছেন ব্রিটেনের ক্রেতারা
যুক্তরাজ্যের ৭৪ শতাংশ ফার্ম অফিস স্পেস কমানোর চিন্তা করছে
জুবের ইশা ও মোহসিন ইশা বৃটেনের সফল দুই ব্যবসায়ী
বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ৩৪ কোটি পাউন্ড অনুদানের ঘোষণা