মাস্ক ব্যাবহার নিয়ে পরিসংখ্যান কী বলছে?
অনলাইন ডেস্ক
নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি থামাতে ক্রিস্টিয়ান বেনকে যখন তার ড্যানিশ সহকর্মী গিনি-বিসাউয়ে জনগণের মাঝে কাপড়ের ফেস মাস্ক বিতরণ করতে বলেন, বেন ঠিক তখনো নিশ্চিত ছিলেন না।
ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ডেনমার্কের বিশ্ব স্বাস্থ্যের গবেষক বেন বলেন, আমি বললাম, হ্যাঁ, এটা হয়তো ভালো। কিন্তু এখানে ডাটার সীমাবদ্ধতা রয়েছে ফেস মাস্ক কতটা কার্যকর সে বিষয়ে।
এটা ছিল মার্চের ঘটনা। কিন্তু জুলাইয়ের মধ্যে বেন এবং তার দল কাজ শুরু করলেন কীভাবে মাস্কের বিষয়ে প্রয়োজনীয় কিছু ডাটা প্রদান করা যায় তা নিয়ে। তারা তখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হাজারো মাস্ক বিতরণ করে স্থানীয় মানুষদের মাঝে। যেটি ছিল একটি নিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালের অংশও। এটি কভিড-১৯-এর বিস্তৃতির বিরুদ্ধে মাস্কের কার্যকারিতা নির্ণয়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও।
ফেস মাস্ক বর্তমানে মহামারী চলাকালে সাবর্জনীন প্রতীকে পরিণত হয়েছে। হাসপাতাল ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রগুলোতে মেডিকেল-গ্রেড মাস্ক ব্যবহার করা হচ্ছে সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের সংক্রমণ হ্রাস করার জন্য। কিন্তু সাধারণ মানুষ যে ধরনের বৈচিত্র্যময় মাস্ক ব্যবহার করে, সে সম্পর্কিত ডাটাগুলো বেশ অগোছালো ও তাড়াহুড়ো করে একত্র করা। এর সঙ্গে আবার যুক্ত আছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতাদের এর ব্যবহার নিয়ে বিভাজনমূলক মন্তব্যও।
মনোবিজ্ঞানী বারুচ ফিশফ বলেন, প্রমাণের দিকে নজর দেয়া লোকেরা একে ভিন্নভাবে নিতে পারে। এটা অনেকটা যৌক্তিকভাবেই বিভ্রান্তিকর।
একটা বিষয় স্পষ্ট যে বিজ্ঞান মাস্ক ব্যবহার করাকে সমর্থন দেয়। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, মাস্ক ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে জীবন বাঁচাতে পারে। যেখানে বলা হচ্ছে, মাস্ক ব্যবহারের ফলে করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি ও এতে আক্রান্ত হওয়া, উভয় আশঙ্কাই হ্রাস পায়। আবার কোনো কোনো গবেষণা বলছে, মাস্ক সম্ভবত সংক্রমণের তীব্রতাকে হ্রাস করে।
কিন্তু এটি কীভাবে কাজ করে এবং কখন ব্যবহার করতে হবে তা নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি জটিল। এখানে বিভিন্ন ধরনের মাস্ক রয়েছে, যা বিভিন্ন পরিবেশে পরা হয়। এখানে মাস্ক পরার প্রতি মানুষের আগ্রহ ও এটি সঠিকভাবে পরা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি কী ধরনের গবেষণা নিশ্চিত প্রমাণ দেবে, যার ফলে মানুষ জানতে পারবে মাস্ক কাজ করে, সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়াও বেশ কঠিন।
গ্রহণযোগ্য মান ছাড়িয়ে
মহামারীর শুরুতে মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রমাণের স্বল্পতা ছিল কীভাবে সার্স-কোভ-২ ছড়ায় সে বিষয়ে। মাস্ক নিয়ে শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য বার্তা দেয়া যায় কিনা তা নিয়েও তাদের দ্বিধা ছিল।
হেলথ কেয়ার সেটিংসের মধ্যে যে মানসম্পন্ন মাস্কটি পরা হয় তা হলো এন৯৫। এটিকে এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন যারা এটি পরবে তারা এর মধ্য দিয়ে ৯৫ শতাংশ বাতাসে ভাসমান কণাকে ফিল্টার করতে পারবে। কিন্তু মহামারী শুরু হওয়ার পরই এর স্বল্পতা দেখা দেয়। তখন প্রশ্ন দেখা দেয় সাধারণ মানুষেরও সার্জিক্যাল মাস্ক পরতে হবে নাকি কাপড়ের মাস্ক পরলেই চলবে। যদি তাই হয়, তবে কোন পরিস্থিতিতে? ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোতে আমরা সেই জিনিসগুলোই সাধারণত করে দেখি। কিন্তু আমাদের সেজন্য যথেষ্ট সময় ছিল না।
ফলে বিজ্ঞানীদের নির্ভর করতে হয়েছে পর্যবেক্ষণমূলক ও ল্যাবরেটরির গবেষণার ওপর। এছাড়া অন্যান্য সংক্রামক রোগের পক্ষ থেকেও পরোক্ষ প্রমাণ ছিল। গ্রাবোউস্কি বলেন, আপনি যদি সবগুলো একসঙ্গে আমলে নেন তাহলে দেখা যাবে তা কাজ করছে।
মাস্কের ওপর বিশ্বাস বাড়তে শুরু করে জুনে গিয়ে। অনেকে এর কার্যকারিতা বাড়ার জন্য আঙুল তোলেন জনসমাবেশের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনে বেশির ভাগই মাস্ক পরে ছিলেন। এই ইভেন্ট থেকে সংক্রমণ বাড়ার ঘটনা ঘটেনি। তবে জুনে জর্জিয়া সামার ক্যাম্পে ভাইরাস দারুণ গতিতে বেড়ে যায়। সেখানে যেসব শিশু উপস্থিত ছিল তাদের মাস্ক পরার বাধ্যবাধকতা ছিল না।
আরো কঠোর বিশ্লেষণগুলো শক্তিশালী প্রমাণ যুক্ত করেছে। আগস্টের শুরুতে একটি প্রিপ্রিন্ট গবেষণা পোস্ট করা হয়েছে, যেখানে দেখা গেছে সপ্তাহে মাথাপিছু মৃত্যুর হার সেই অঞ্চলগুলোতে চার ভাগ কম, যেখানে মাস্ক পরার রীতি প্রচলিত আছে। গবেষকরা দৃষ্টি দিয়েছিলেন ২০০টি দেশের দিকে। যেখানে মঙ্গোলিয়াও ছিল, যারা জানুয়ারিতে মাস্ক পরার রীতি চালু করেছিল। যেখানে মে মাসে এসেও কভিড-১৯ সম্পর্কিত কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। আরেকটি গবেষণা দৃষ্টি দিয়েছিল এপ্রিল ও মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মাস্ক পরার নির্দেশনার দিকে। গবেষকদের হিসাব মতে, এর ফলে দিনপ্রতি কভিড-১৯-এর কেস হ্রাস পেয়েছে ২ শতাংশ পর্যন্ত।
তারা সতর্কতার সঙ্গে উল্লেখ করেছে যে সুরক্ষা নীতিগুলো মেনে চলার ফলে প্রায় সাড়ে চার লাখ সংক্রমণ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল।
ইউনিভার্সিটি অব সানফ্রান্সিসকোর রিসার্চ সায়েন্টিস্ট জেরেমি হাওয়ার্ড বলেন, মাস্ক যে সুরক্ষা দিচ্ছে তা বলার জন্য আপনাকে অনেক অংক কষে দেখতে হবে না।
কিন্তু এ ধরনের গবেষণা এমন অনুমানের ওপর নির্ভর করে যে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে এবং মানুষ সঠিকভাবে তা পরছে। অবশ্য মাস্ক পরা অন্য পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যেমন মানুষের জমায়েতকে হ্রাস করা। এসব নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে পরবর্তী পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণাগুলো মাস্কের প্রভাবকে অন্য হস্তক্ষেপগুলো থেকে আলাদা করতে শুরু করবে। গার্বোভস্কি বলেন, তখন কী থেকে কী ঘটছে তা বুঝতে পারা আরো সহজ হয়ে যাবে। যদিও মানুষের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা বিভ্রান্তিকর পরিবর্তনগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, যা তারা প্রাণীদের ক্ষেত্রে করতে পারে। হংকংয়ে একটি গবেষণায় সুস্থ ও সংক্রমিত হামস্টারকে (্ইঁদুরজাতীয় প্রাণী) একটি খাঁচায় রাখা হয়েছিল। যেখানে কিছু হামস্টারকে আলাদা করা হয় মাস্ক পরিয়ে। যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ অসংক্রমিত প্রাণী সার্স-কোভ-২ তে আক্রান্ত হয়েছিল। এ পেপারটি মে মাসে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে মাস্ক পরাদের কেবল ২৫ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছিল। পাশাপাশি মাস্ক পরাদের চেয়ে না পরাদের অসুস্থতা বেশি তীব্র ছিল।
এ অনুসন্ধানগুলো এটিই দেখায় যে মাস্ক যারা ব্যবহার করে এটি তাদের সঙ্গে অন্যদেরও রক্ষা করে। পাশাপাশি এখানে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে, মাস্ক পরা কেবল আপনাকে সংক্রমণ থেকেই রক্ষা করে না, বরং মারাত্মক অসুস্থতা থেকে রক্ষা করে।
তবে কোন মাস্ক সুরক্ষা দেবে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এমনকি এন-৯৫ মাস্কও বাইরের পরিবেশে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কিছুটা কার্যকারিতা হারায়। তবে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সার্জিক্যাল এবং কাপড়ের মাস্ক সুরক্ষা দিতে পারে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত।
নেচার জার্নাল থেকে সংক্ষেপে অনূদিত