ভার্চুয়াল পৃথিবীতে সন্তান কী করছে, তার খোঁজখবর রাখছেন তো?
ফারহানা রেইন
বিশ্ব জুড়ে এই মুহূর্তে ভয়ঙ্কর আতঙ্ক অবশ্যই করোনাভাইরাস। কিন্তু আরও এক নিঃশব্দ মারণরোগে ভুগছে সমাজ। তা হল আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার। যা নিঃসঙ্গ করছে আমাদের।ভার্চুয়াল প্রযুক্তি কতটা ব্যবহার করছেন বয়স্ক মানুষেরা? ব্যবহার করছে মূলত আজকের প্রজন্ম। তার বেশির ভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক। আঠারো ১৮ বছরের নীচে। সমস্যা সেখানেই। যার ফলে বই পড়ার অভ্যাস ক্রমশ কমে যাচ্ছে। ট্রামে, বাসে, ট্রেনে, বিমানবন্দরে সর্বত্র নতুন প্রজন্ম ব্যস্ত মুঠোফোনে। হয় গান, নয় সিনেমা, নয় তো সামাজিক মাধ্যম। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কেমন যেন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে নিজস্ব ভার্চুয়াল জগতে ঠাঁই নিয়েছে। যে কারণে বাড়ছে যান্ত্রিকতা।
লকডাউন, অনিশ্চয়তা, বাড়তি কাজের চাপ, অর্থচিন্তা যেভাবে আপনাকে-আমাকে গ্রাস
করেছে, ঠিক সেভাবেই তা প্রভাব ফেলছে আপনার পরিবারের কিশোর বা তরুণ সদস্যের মনেও। যেহেতু
আমাদের বয়স হয়েছে, জীবনে আসা নিত্যদিনের চাপের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও বেড়েছে।
কিন্তু বয়ঃসন্ধির সময়কার বাচ্চাদের কাছ থেকে সে স্থৈর্য আশা করাও ঠিক নয়। এই যে বাড়ির
চার দেওয়ালের মধ্যে দিন-রাত আটকে থাকতে থাকতে আমাদের হাঁফ ধরছে, আমরা দারুণভাবে অফিসের
আড্ডাগুলোকে মিস করছি -- ঠিক সেই একই অসুবিধে তাদেরও হচ্ছে।
স্কুলে-কলেজে বাচ্চারা নিজেদের মতো করে অনেকটা সময় কাটায়। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলো
করে – সে সব এখন বন্ধ। উলটে সারাক্ষণ মা-বাবার খবরদারিতে
থাকতে হচ্ছে বলে বিরক্তি বাড়ছে ক্রমশ। তার পর আছে অনলাইন দুনিয়া। এ কথা অস্বীকার করার
কোনও জায়গা নেই যে আমাদের জীবনে অপরিহার্য জিনিসের তালিকায় ক্রমশ ঢুকে পড়ছে ইন্টারনেট।
তা কাজের তো বটেই, বিনোদন আর অবসরযাপনের মাধ্যমও। সবচেয়ে বড়ো কথা, নিজেকে মুখোশের আড়ালে
লুকিয়ে রাখা যায় বলে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বদলে যায় মানুষের ব্যবহার। কোথায় থামতে হয়,
সেই বোধ না থাকলে ঘটে যেতে পারে বড়ো বিপর্যয়। বড়োরাই কত ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেন – ছোটোদের ভুল হওয়ার আশঙ্কা আরও বেশি। তারই এক মারাত্মক
চেহারা আমরা দেখতে পাচ্ছি এখন -- 'বয়েস লকার রুম' নামক স্ক্যান্ডালের কথা আপনিও শুনেছেন
নিশ্চয়ই?
ফেক অ্যাকাউন্ট, সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স, মহিলাদের প্রতি ঘৃণ্য মনোভাব, কাউকে অপছন্দ হলে
তাকে বিপদে ফেলার চেষ্টা – একসঙ্গে অনেকগুলো বিষয়
প্রকাশ্যে এনেছে এই ঘটনা। সারা বিশ্ব জুড়ে সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি চিন্তাভাবনা
শুরু করেছে কোন ধরনের কনটেন্ট দেখলেই তার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত তা নিয়ে। আপনার-আমারও
একবার ভেবে দেখা উচিত এই পরিস্থিতিতে। যাদের বাড়িতে কিশোর-বয়সী বা দ্রুত কৈশোরের দিকে
এগোচ্ছে এমন সদস্য আছে, তাদের কী করা উচিত এই পরিস্থিতিতে? দিশা দেখিয়েছেন ‘অনুভব’
ক্লিনিকের প্রধান ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট পারমিতা মিত্র ভৌমিক। পারমিতার বক্তব্য হল,
"আজ যেটা দেখে আমরা শিউরে উঠছি, সেটা একটা ফল-আউট। এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি,
দীর্ঘদিন ধরে একটু একটু করে সমস্যাটা দানা বেঁধেছে। একটা ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে বটে,
কিন্তু এ ধরনের ঘটনা যাতে বার বার না ঘটে, তার দায় নিতে হবে অভিভাবকদের।" তাঁদের
জন্য কিছু নিয়মও বাতলে দিয়েছেন পারমিতা।
এক নম্বর, বাচ্চাকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে দেবেন না। অভিভাবক হিসেবে এটা আপনার প্রথম
দায়বদ্ধতা। নিরাপত্তাহীনতা থেকেই জন্ম নেয় অবিশ্বাস। আর ছোটো থেকেই মনে অবিশ্বাস বাসা
বাঁধলে পরের দিকে কোনও সম্পর্কই টিকবে না। তখন প্রেম, বিয়ে -- সব কিছুই ভেঙে পড়বে।
বাচ্চার সঙ্গে খুব ছোটো থেকে ‘সিকিওরড অ্যাটাচমেন্ট’ গড়ে তুলতে হবে মা-বাবাকে।
দুই, বাবা-মায়ের সম্পর্ক ভালো না হলে বাচ্চার মানসিক গঠনে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য।
অনেকেই ভাঙতে বসা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখেন স্রেফ বাচ্চার মুখ চেয়ে। সেখানেও যদি নিত্যদিন
ঝগড়া, গালিগালাজ, দোষারোপ চলতে থাকে, তা হলেও বাচ্চা সুস্থভাবে বড়ো হবে না। বাচ্চার
বোঝা দরকার মা-বাবার কাছে সে সুরক্ষিত এবং পরিবারের সঙ্গে থাকলে আর কিছুর প্রয়োজন নেই।
আজকাল কিন্তু কারও প্রয়োজনই চট করে মেটে না -- সোশাল মিডিয়ায় কে কতগুলো লাইক পাচ্ছে,
তা-ও বিরাট বড়ো ব্যাপার। চাহিদা যত বাড়বে, তা মেটানোর জন্য মন-ও তত জটিল রাস্তা খুঁজে
বের করবে। সিকিওরড অ্যাটাচমেন্ট গড়ে উঠলে কিন্তু মানুষ এভাবে যেন-তেন প্রকারে চাহিদা
মেটানোর কথা ভাবে না। তাদের সম্পর্কও সুস্থ ও সুন্দর হয়, তারা এন্ডোর্সমেন্টে বিশ্বাস
করে না।
তিন, নেট আর ফোন ছাড়া আমাদের কারওই চলবে না, একেবারে ঠিক কথা। কিন্তু সেটা যেন আপনাকে
পরিবারের মধ্যেই আলাদা একটা দ্বীপের বাসিন্দা না করে দেয়, সেটা দেখতে হবে। কাজের সময়টা
আলাদা, তা বাদে ভার্চুয়াল সম্পর্ক বেশি সিরিয়াসলি নেওয়ার দরকার নেই। আপনার ব্যক্তিগত
জীবনে ভার্চুয়াল পৃথিবীর প্রভাব খুব বেশি হলে বাচ্চার জীবনেও সেটাই ছাপ ফেলবে। আপনি
যদি অন্য কোনও সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, তা হলে কিন্তু কাছের মানুষরা ঠিক বুঝতে পারবে সে
কথা।
চার, হ্যাঁ, এটা ঠিক, যে পৃথিবীতে আগামীদিনে আবার নতুন করে পা রাখবে আমাদের সন্তান,
সেখানে সোশাল ডিসট্যান্সিং বা শারীরিক দূরত্ব খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু
শারীরিক দূরত্ব বাড়লেও মানসিক গ্যাপ কমিয়ে আনার কথা বোঝাতে হবে। কথা বলার জায়গা যেন
সব সময় খোলা থাকে, সেটা দেখতে হবে।
পাঁচ, রাতারাতি কোনও মানুষ বদলায় না। আপনার সন্তানও বদলাবে না। মা-বাবা বা বাড়ির অন্য
যে ক'জনের সঙ্গে বাচ্চার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ, তাদের ব্যক্তিত্বের ছাপ পড়বেই তার জীবনে।
আপনি রয়ে যাবেন আপনার সন্তানের অবচেতন মনে। তাই আপনি নিজের জীবনটা আগে গুছিয়ে নিন,
তা না হলে সন্তানের সমস্যা বাড়বে।
ছয়, বাচ্চার সঙ্গে খোলা মনে কথা বলার জায়গা রাখতে হবে। সন্তানের বয়স 15 পেরিয়ে যাওয়ার পর তো তার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতেই হবে। বাচ্চা যে সব সময় আপনার পরামর্শ নেবে, বা যা বলছেন তাই শুনবে তেমনটা না-ও হতে পারে। কিন্তু তাকে দাঁড়িপাল্লায় তুলে বিচার করবেন না। সে ভুল বলুক, যৌনতার কথা বলুক, সব শুনুন, তাকে অ্যাটেনশন দিন। তার বয়সে এই লাগামছাড়া ইচ্ছেগুলো হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু মন খুলে কথা বলতে পারাটা একান্ত জরুরি। তা হলেই সে ভার্চুয়াল পৃথিবীতে কী করছে, সে তথ্যও গোপন থাকবে না আপনার কাছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে আফিমের নেশায় বুঁদ করে ইংরেজরা চিনের জনগণের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের ড্রাগ, যেমন, মারিজুয়ানা, হেরোইন, ব্রাউন সুগার, কোকেন, গাঁজা প্রভৃতির কারণে তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মেরুদণ্ড অনেকাংশে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেই ষাটের দশক থেকে সত্তরের দশকের গোড়া পর্যন্ত ভিয়েতনামে শক্তিশালী আমেরিকান সেনাবাহিনীর পতনের অন্যতম কারণ ছিল ড্রাগের নেশা। আর আজ ঠিক একই ভাবে আধুনিক প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে, বিশেষত মুঠোফোনে সোশ্যাল মিডিয়ামের ব্যবহার নতুন প্রজন্মকে মানসিক ভাবে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলেছে। এটা কাঙ্ক্ষিত নয়।