আমেরিকার ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’
সম্পাদনা:জিয়াউদ্দীন চৌ:( জেড সেলিম)
‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ নামটা শুনে অনেকেই দিনটাকে অলক্ষুণে মনে করে থাকেন। মনে করেন, অশুভ বলেই হয়তো আমেরিকানরা দিনটাকে ‘ব্ল্যাক’ বলে অভিহিত করে। আসলে কিন্তু তা নয়।
ব্ল্যাক ফ্রাইডে আমেরিকার জনগণের কাছে বহু আকাঙ্খিত একটি দিন। অনেক আমেরিকান সারা বছর ধরে শুধুমাত্র এই দিনটির আশায় বসে থাকেন। এই দিনে আমেরিকার প্রায় সব ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য অস্বাভাবিক মূল্য ছাড়ে বিক্রি করে দেয়। ফলে আমেরিকায় সারা বছরে যে পরিমাণ বেচা-কেনা হয়, তার প্রায় অর্ধেক পরিমাণ হয় শুধুমাত্র এই একটি দিনেই।
কিন্তু বেচা-কেনা বাড়লে তো ব্যবসায়ী এবং ক্রেতা উভয়ের জন্যই লাভজনক। তাহলে কেনো শুধু শুধু এই দিনের নাম ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’?আমেরিকায় নভেম্বর মাসের চতুর্থ বৃহস্পতিবার পালিত হয় ‘থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’। এদিন আমেরিকার জনগণ একে অপরকে ধন্যবাদ জানায়। ঠিক এর পরদিন শুক্রবার পালিত হয় ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’।
ব্ল্যাক ফ্রাইডে’র দিন পুরো আমেরিকায় এতো বিপুল পরিমাণ বেচা-কেনা হয় যে, এই একদিনে আমেরিকার অর্থনীতির সূচক এক লাফে অনেকখানি সামনে এগিয়ে যায়। সারা বছর লাল কালিতে লোকসান বা বাকি লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া ব্যবসায়ীরা এদিন দোকানের খাতায় লাভের অঙ্ক লিখে কূল পান না। আর লাভ তো লিখতে হয় কালো কালিতেই! তাই এদিনের নাম ব্ল্যাক ফ্রাইডে হতে পারে।
তবে আসল ঘটনা আরও অনেক পেছনে। ১৮৬৯ সালের কথা। আমেরিকায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা চলছিল। ব্যবসায়ীরা নিজের দুরবস্থা কাটাতে ভাবলেন এক অভিনব পন্থার কথা। তারা ঠিক করলেন একটি দিন ঠিক করে নতুন নতুন পণ্য, মূল্য হ্রাসের টোপ ফেলে ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী করে তুলবেন। আর তখনই উদ্ভব হয় ব্ল্যাক ফ্রাইডে। ব্ল্যাক শব্দটি নেকিবাচক অর্থ বহন করলেও ব্ল্যাক ফ্রাইডের ‘ব্ল্যাক’ শব্দটি ব্যবসায়িক দিক থেকে ইতিবাচক দিককে নির্দেশ করে।
মজার ব্যাপার হলো, একটি ব্ল্যাক ফ্রাইডে দিবসে যে পরিমাণ বিক্রি হয়, তাতে এই একদিনেই আমেরিকার অর্থনীতির সূচক এক লাফে অনেক উপরে উঠে যায়। সাধারণত হিসাবের খাতায় লোকসানকে লাল কালিতে চিহ্নিত করা হলেও এ দিবসের শুরুর দিন থেকেই হিসাব-নিকাশ কালো কালিতে লেখা শুরু হয়ে যায়। কাজেই ব্যবসায় বিরাট লাভ দিয়ে যে দিনটি শুরু হয়, সে দিনকে যথার্থই ব্ল্যাক বলা যায়।
তবে ব্ল্যাক ফ্রাইডে নামটি এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন উৎস থেকে। ১৯৬৬ সালে ফিলাডেলফিয়া রাজ্য পুলিশ থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’র পরের দিনকে ব্ল্যাক ফ্রাইডে নামে অভিহিত করেছিল। কারণ এই দিনে আমেরিকায় বছরের সবচেয়ে বড় সেল ও বছরের সবচেয়ে উত্তেজনাকর ফুটবল গেম অনুষ্ঠিত হতো। এ খেলার প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত আমেরিকান সেনাবাহিনী। এ খেলার কারণে শহরের রাস্তাজুড়ে থাকতো ট্রাফিক জ্যাম। এ ছাড়া ফুটপাতে মানুষের প্রচণ্ড ভিড় সামলাতে পাগলপ্রায় হয়ে যেত ফিলাডেলফিয়ার পুলিশ ও বাস ড্রাইভাররা। এদিনকে সামনে রেখে আমেরিকার রিটেইল স্টোরগুলো এবং আসবাবপত্রের দোকানগুলো বিভিন্ন ছাড় ও পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে থাকে। এছাড়া ছোট-বড় বিভিন্ন কোম্পানি দু’-তিন সপ্তাহ আগে থেকেই ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেল উপলক্ষে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারণা চালাতে থাকে। টিভি-রেডিও এবং প্রতিদিনের সংবাদপত্রে প্রচার চালানোর পাশাপাশি প্রত্যেক বাড়ির মেইলবক্সে রঙিন সেল পেপার দেয় তারা। কে কী আইটেম নিয়ে বাজারে আসছে অথবা কে কত বেশি আকর্ষণীয় মূল্যে পণ্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেবে, এটা নিয়ে কোম্পানিগুলোর মধ্যে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। বিক্রেতাদের পাশাপাশি ক্রেতারাও থাকেন উত্তেজিত।
এদিনটি আসার দুই-তিন সপ্তাহ আগে থেকেই ক্রেতারা চিন্তা করতে থাকেন, তারা কোনো আইটেমগুলো কিনবেন। এদিনে সাধারণত ব্ল্যাক ফ্রাইডেকে সামনে রেখে ক্রেতাদের মধ্যে থাকে তীব্র উত্তেজনা। কখনো কখনো আগের রাত থেকেই ক্রেতারা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। আর এ কারণে কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটে। যেমন: ২০০৭ সালে নিউইয়র্কে ঘটেছিল একটি দুঃখজনক ঘটনা। ব্ল্যাক ফ্রাইডের সেলে ওয়ালমার্টে ঢোকার জন্য আগের রাত ৯টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিল মানুষ। ভোর ৫টায় দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে বন্যার পানির মতো মানুষ ঢুকে পড়ে দোকানে। তাদের ধাক্কায় ৩২ বছর বয়সী এক লোক মাটিতে পড়ে পদপিষ্ট হয়ে শেষ পর্যন্ত মারা যায়। ১৮৬৯ সালে চালু হওয়া এই ব্ল্যাক ফ্রাইডে এখনও চালু আছে।