আপনার সন্তান কি অনলাইন ক্লাস করছে? তা হলে মেনে চলুন কয়েকটি নিয়ম
হাফসা এ্যানি
অনলাইন ক্লাস ব্যাপারটার সঙ্গে আপনার সন্তান এবং আপনি নিজে যত তাড়াতাড়ি
মানিয়ে নিতে পারবেন, ততই মঙ্গল। শহরের অধিকাংশ স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, বাচ্চা বা
কিশোর-কিশোরীদের সামলানোর মানসিক প্রস্তুতি থাকে শিক্ষকের, তাদের স্বাভাবিক দুষ্টুমি
বা অবাধ্যতার সঙ্গে তাঁরা পরিচিত। কিন্তু বাড়ি থেকে লেখাপড়ার ব্যবস্থা হওয়া ইস্তক অভিভাবকরা
বড্ড নাক গলাচ্ছেন পঠনপাঠনে। সেটা সামলাতে অনেক বেশি অসুবিধে হচ্ছে। তাই প্রথমে আপনি
সতর্ক হোন। বাচ্চা দুর্বল হোক, অতি স্মার্ট হোক – স্কুলের ক্লাস
চলার সময়ে নাক গলাবেন না। গোড়ায় অসুবিধে হলেও তারা খুব দ্রুত মানিয়ে নেবে পরিস্থিতির
সঙ্গে। আর ছোটোখাটো কিছু দুষ্টুমিও সে করতে পারে, সেটা শিক্ষক সামলাবেন। সেখানে আপনার
ঢোকার দরকার নেই। অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার বা ক্লাসে অংশ নেওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি মাধ্যম আপনি
ব্যবহার করতে পারেন। এমনই কয়েকটি মাধ্যম তুলে ধরা হলো
সেই সঙ্গে বাচ্চাকেও কয়েকটি বিষয় শেখাতে হবে। যেমন, অনলাইন ক্লাস চলার সময়েও স্কুলের
ডিসিপ্লিন মানাটাই নিয়ম। ক্লাস শুরুর আগেই তাকে প্রস্তুত থাকতে হবে, প্রতিদিনের কাজ
শেষ করতে হবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। সাধারণত অ্যাটেনডেন্স মার্ক করার আগে শিক্ষক ভিডিয়ো
অন করতে বলেন, তাই স্কুলের পোশাক পরে তৈরি হয়ে ক্লাসে বসতে হবে। ক্লাস চলাকালীন ভিডিয়ো
এবং অডিয়ো অফ রাখতে বলা হয় -- তা না মানলে শিক্ষকের পড়াতে অসুবিধে হয়। সে নিয়ম অক্ষরে
অক্ষরে মেনে চলা উচিত। সাধারণত সব শিক্ষকই ছাত্রকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেন, কোনও অসুবিধে
থাকলে তখনই জেনে নিতে হবে। বাচ্চা ক্লাসে মন দিচ্ছে কিনা, নোট নিচ্ছে কিনা, সেটা আপনি
দেখলেই বুঝবেন। তবে তখনই হামলে পড়ে বকাঝকা করার দরকার নেই। পরে তার সঙ্গে কথা বলুন,
বোঝান যে এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। মনে রাখবেন, বন্ধুবান্ধবদের
সঙ্গে আড্ডা বা খুনসুটি সেও খুব মিস করছে -- তাই অযথা বকাবকি না করে তাকে বোঝান। যুক্তি
দিয়ে বোঝালে বাচ্চারা সব কথা শোনে।
সন্তান স্কুলের কাজ ঠিকমতো করছে কিনা বা শিক্ষকের দেখিয়ে দেওয়া ভুল শুধরে নিচ্ছে কিনা
সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন। প্রথমদিকে একটু এদিক ওদিক হতে পারে, কিন্তু এই পরিস্থিতি
কবে বদলাবে কেউ জানে না। তাই নতুন পৃথিবীর জন্য তাকে আজ থেকেই তৈরি করুন।
কোর্সেরা
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৪ কোটি ৭০ লাখ শিক্ষার্থী-শিক্ষক এক হওয়ার সুযোগ পান
কোর্সেরা (www.coursera.org) প্ল্যাটফর্মে। কোর্স ফি দিয়ে যে কেউ বিভিন্ন
বিষয়ের নামী অধ্যাপকদের কোর্সে অংশ নিতে পারেন, কিন্তু কোভিড–১৯ ছড়িয়ে পড়ার পর
এই সময়ে শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে ৪০০ বিষয়ে ৩ হাজার ৮০০টি কোর্স বিনা মূল্যে দিচ্ছে
কোর্সেরা। তবে এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে (www.coursera.org/coronavirus) লিংকে আবেদন করতে
হবে। তারপর ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কর্তৃপক্ষের বাছাই করা কোর্সগুলোতে অংশ
নেওয়ার সুযোগ পাবেন। কোর্সেরাতে বিশ্বমানের অধ্যাপক ও প্রফেশনালরা কোর্স পরিচালনা করেন।
তাই কোর্সের মান তুলনামূলক ভালো। ভিডিও ক্লাসের পাশাপাশি থাকে কুইজপর্ব। আর কোর্স শেষে
মিলবে অনলাইন সনদ।
জুম
অধিকাংশ সময় অফিসের কাজে ব্যবহৃত হলেও চাইলে জুমকে বানিয়ে নেওয়া যায় ক্লাসরুম। চমকপ্রদ
একটি সফটওয়্যার এই জুম। বিনা মূল্যে ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও সামান্য কিছু টাকা খরচ
করলে আরও আধুনিক সেবা দিতে পারে সফটওয়্যারটি। ১০০ জন একই সঙ্গে একই ভিডিও কনফারেন্সে
যোগ দিতে পারেন। বিনা মূল্যে ব্যবহার করলে প্রতিটি কনফারেন্সের সময় হবে ৪০ মিনিট। ব্যবহারকারী
আইডিভিত্তিক ব্যক্তিগত মিটিং এবং গ্রুপ মিটিং আয়োজন করতে পারেন। বাস্তবের ক্লাসের মতোই
এই সফটওয়্যারে প্রশ্ন করার জন্য হাত তোলার সুযোগ থাকছে। এ ছাড়া কেউ কিছু লিখে বোঝাতে
চাইলে প্রতিটি স্ক্রিনে ভেসে উঠবে একটি হোয়াইট বোর্ড।
ইউটিউব লাইভ
ভিডিও শেয়ারিংভিত্তিক সবচেয়ে বড় সাইট হচ্ছে ইউটিউব। কেউ চাইলে তাঁর নির্ধারিত অ্যাকাউন্ট
ব্যবহার করে চালু করতে পারেন চ্যানেল। চ্যানেলে বিষয়ভিত্তিক ক্লাসের ভিডিও আপলোড করা
যাবে। চাইলে সেই ভিডিওতে ‘প্রাইভেট’ অপশন চালু করে শুধু নির্ধারিত শিক্ষার্থীদের দেখানো
যাবে। আবার একবারে সব ভিডিও আপলোড করে কোর্সের নির্ধারিত সময়ে ভিডিও প্রিমিয়ার করা
যাবে। সারা বিশ্বে গোটা কয়েক দেশ বাদে সব জায়গায় ইউটিউব কাজ করে। ভিন্ন ভিন্ন ইন্টারনেট
সুবিধা আর রেজল্যুশনের ছক মিলিয়ে ইউটিউব হয়ে উঠতে পারে অনলাইন ক্লাসের চমকপ্রদ সমাধান।
ফেসবুক লাইভ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে পড়াশোনার ক্লাসরুম বানিয়েও কাজে লাগাতে পারেন যে কেউ। কোর্সভিত্তিক
আলাদা আলাদা গ্রুপে লাইভ ক্লাস নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া যেকোনো ডকুমেন্ট, প্রেজেন্টেশন,
নোটস বিনিময়ের সুবিধা তো থাকছেই। লাইভ ক্লাস চলাকালে কমেন্টে শিক্ষার্থীরা জানাতে পারবেন
তাঁদের সমস্যার কথা। ঠিক ওই সময়ে ক্লাসে উপস্থিত না থাকতে পারলেও পরে গ্রুপে ভিডিও
হিসেবে থেকে যাবে এই লাইভ ক্লাসগুলো। তাই কোনো শিক্ষার্থী লাইভ ক্লাস মিস করে গেলেও
পরে আবার গ্রুপের ওয়াল থেকে জেনে নিতে পারবেন।
গুগল ক্লাসরুম
আমাদের দেশে অনেক শিক্ষকই এখন গুগল ক্লাসরুম (classroom.google.com/) ব্যবহার করে ক্লাস
নিচ্ছেন। বিনা মূল্যে কোনো শিক্ষক চাইলে গুগল স্যুটে নিবন্ধন করতে পারেন। তারপর নির্ধারিত
কোড দিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করতে পারবেন ওই ক্লাসে। একটি কোর্সে অসংখ্য ক্লাসের পাশাপাশি
২০ জন শিক্ষক তাঁদের ক্লাস যুক্ত করতে পারবেন। অ্যাসাইনমেন্টের জন্য গুগল ফরম, গুগল
ডক, গুগল ড্রাইভ ও ইউটিউব ভিডিও যুক্ত করার সুযোগ থাকছে। ক্লাসরুমে থেকে যাওয়া ক্লাসের
ভিডিওগুলো পরেও দেখা যাবে। শুধু কম্পিউটার নয়, যেকোনো ডিভাইস থেকে শিক্ষার্থীরা অংশ
নিতে পারবেন অনলাইন ক্লাসে।
মাইক্রোসফট টিম
বাজারের সব অনবদ্য সফটওয়্যার কোম্পানির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাইক্রোসফট তাদের ব্যবহারকারীদের
জন্য বানিয়েছে মাইক্রোসফট টিম। কেউ যদি মাইক্রোসফট অফিস ৩৬৫ ব্যবহার করা শুরু করেন,
তাঁর জন্য সুযোগ থাকছে মাইক্রোসফট টিম ব্যবহারের। ক্লাসের ভিডিও আপলোডের পাশাপাশি শিক্ষক
সরাসরি শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করার সুযোগ পাবেন এখানে। ক্লাসের সবাইকে দলগত আলোচনার সুবিধা
দিতে মাইক্রোসফট টিমে থাকছে চ্যাটবক্স। তবে এতজন একসঙ্গে কথা বলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ
মেসেজ যেন হারিয়ে না যায়, সে জন্য শিক্ষক নির্ধারিত বিষয়কে চ্যাটবক্সের একদম ওপরে রেখে
দিতে পারেন। মাইক্রোসফট টিম ব্যবহার করার সময় সরাসরি ই–মেইল স্কাইড্রাইভ
ও শেয়ার পয়েন্ট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা। বরাবরের মতোই যেকোনো
ডিভাইস থেকে এই টিম ব্যবহারের সুযোগ থাকছে। ব্যবহারকারীকে আরও সুবিধা দিতে মাইক্রোসফট
টিমে আছে চ্যাটবট। শিক্ষক কোথায় কী প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন এবং কোথায় কী আপলোড করেছেন,
সেসবের দিকনির্দেশনা দেবে এই চ্যাটবটগুলো। আরও বিস্তারিত জানা যাবে এখানে: teams.microsoft.com/start