ইতিহাসের সাক্ষী:পম্পেই নগরীতে ২ হাজার বছরের প্রাচীন রেস্তোরাঁর সন্ধান
সম্পাদনা:জিয়াউদ্দীন চৌ:(জেড সেলিম)
শনিবার পম্পেইয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা ২ হাজার বছরের প্রাচীন সেই ছাই চাপা নগরীর একটি রেস্তোরাঁর (স্ট্রিট ফুড) আবিষ্কার করেছেন। প্রাচীনকালে রোমান পথচারীরা বিভিন্ন গরম খাবার এবং পানীয় পান করার জন্য যে ধরনের স্ট্রিট ফুড ব্যবহার করতেন, এই রেস্তোরাঁটি সেই ধরনের বলে ধারণা করছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
প্রাচীন সেই ছাই চাপা নগরীর একটি রেস্তোরাঁর
সম্প্রতি এই শহরটি থেকে দুই ব্যক্তির দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। আর এবার
এই খাবারের দোকানটি উন্মোচন করলো পম্পেই প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ। এ খবর দিয়েছে বার্তা
সংস্থা রয়টার্স।
লাতিন ভাষায় টার্মোপলিয়াম বা গরম পানীয়’র এই রেঁস্তোরাটি প্রত্নতাত্ত্বিক পার্ক রেজিও
ভি সাইটের ভিতরে আবিষ্কার করা হয়েছে। যা এখনো জনসাধারণের প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত
করা হয়নি।
প্রায় ২ হাজার বছরের পুরাতন এই খাবারের দোকানটিতে দোকানিরা সে সময়ে খাবার
গরম রাখার জন্য টেরাকোটার পাত্রগুলো গোলাকার ছিদ্রযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করতো।
সে সময় দোকানের সামনের অংশকে আকর্ষণীয় করার জন্য উজ্বল রংয়ের ফ্রেস্কো (মুরাল পেইন্টিংয়ের
একটি কৌশল) এবং যে সব খাবার বিক্রি করা হতো এমন খাবারের চিত্রও ব্যবহার করতো। এছাড়া
দোকানিরা ক্রেতাদের খাবারের প্রতি আকর্ষিত করতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতো। যেমন-
মুরগি বা হাঁসগুলোকে উল্টো করে ঝুঁলিয়ে রাখতো।
এ বিষয়ে পম্পেই প্রত্নতাত্ত্বিক পার্কের পরিচালক মাসিমো ওসানা বলেন, এটি একটি অসাধারণ
আবিষ্কার। প্রথমবারের মতো আমরা একটি সম্পূর্ণ টার্মোপোলিয়াম খনন করতে সক্ষম হয়েছি।
খননকৃত স্থানটি থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা একটি সুসজ্জিত ব্রোঞ্জের বাটি- যা পাটেরা হিসাবে
পরিচিত, কিছু চিনা মাটির পাত্র- যেগুলো স্যুপ, স্টু বা পানীয় তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহার
করা হতো এমন অনেক নিদর্শন উদ্ধার করেছেন।
নৃবিজ্ঞানী ভ্যালরিয়া আমোরেত্তি বলেন, আমাদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে এটা প্রমাণিত যে,
এই উন্মোচিত স্থানটি প্রাচীনকালে খাবার ও পানীয় বিক্রির কাজে ব্যবহার করা হতো। খাবার
ও পানীয় হিসাবে এখানে ব্যবহৃত পাত্রগুলোতে শূকরের মাংস, মাছ, শামুক এবং গো-মাংসের চিহ্ন
পেয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিকরা। যা সেই সময়ের মানুষের খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন ধরণের প্রাণীজ
ব্যহারেরও সাক্ষ্য হিসেবে অভিহিত করেন আমোরেত্তি। ৬৬-হেক্টর বা ১৬৫ একরের এই প্রাচীন
শহরটির দুই-তৃতীয়াংশ এখনো অনাবৃত অবস্থায় রয়েছে। এই ধ্বংসাবশেষগুলো ১৬ শতাব্দী পর্যন্ত
অনাবিষ্কৃত অবস্থায় ছিলো এবং ১৭৫০ সালে এসে প্রথম এর খনন কাজ শুরু হয়।
ইতালির পম্পেই নগরীটি ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত নেপলসের একটি পরিকল্পিত শহর।
শহরটিতে ১৩ হাজার মানুষের বাস ছিল। তারা আগ্নেয়গিরির লাভার নিচে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিলেন।
গ্রিক-রোমান সভ্যতার এক অন্যতম নিদর্শন এই পম্পেই নগরী, যা ইতালির সবচেয়ে জনপ্রিয় আকর্ষণগুলোর
মধ্যে একটি। এটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত।
পৃথিবীর প্রাচীনতম অভিজাত জনপদগুলোর একটি ছিল এই পম্পেই নগরী। সে সময় প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি ছিল নগরটি। এটি ছিল দুই হাজার বছরের পুরনো একটি অভিজাত শহর। ইতালির তৎকালীন রাজা ওসকান খ্রিস্টপূর্ব ছয় থেকে সাত শতাব্দীর দিকে এই শহরের গোড়াপত্তন করেন। এরপর ইউরোপে সংঘটিত বিভিন্ন পর্যায়ের যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে খ্রিস্টপূর্ব ৮০ শতাব্দীর দিকে এই শহরটিতে রোমান সাম্রাজ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়। আর সেখানে গড়ে ওঠে রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম শিল্পবন্দর। তখন থেকেই রোমানরা সেখানে বসবাস শুরু করে। ক্রমান্বয়ে সেটি হয়ে ওঠে সমকালীন বিশ্বের অন্যতম বিত্ত-বৈভব আর অভিজাত নগরী। রোমান আর গ্রিক বণিকদের ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয় এই শহর। ভূমধ্যসাগরের উপত্যকায় ভিসুভিয়াস পাহাড়ের পাদদেশে নেপলস শহরের পাশেই গড়ে উঠেছিল শহরটি।
শহরটি বাণিজ্যনগরীর পাশাপাশি ধীরে ধীরে সারা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম বিনোদননগরীর মর্যাদাও অর্জন করতে সক্ষম হয়। কারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিপুল সমাহার কাজে লাগিয়ে রোমানরা এটিকে অপরূপ সজ্জায় সজ্জিত করতে পেরেছিল। গড়ে উঠেছিল নানা ধরনের বিনোদনকেন্দ্র, যার টানে সমগ্র পৃথিবীর ভ্রমণপিপাসু অভিজাত সমাজ ভিড় করতে থাকল সেখানে। সবাই অবসর কাটানোর জন্য ছুটে যেত প্রাচীনকালের আধুনিক সভ্যতার সব ধরনের চিত্তরঞ্জনের সমাহার থাকা এই প্রাণচঞ্চল শহরে। বণিক ও পর্যটকদের জন্য সেখানে গড়ে উঠেছিল অত্যাধুনিক দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা আর প্রমোদকেন্দ্র। সহায়-সম্পদ আর বিত্ত-বৈভবের অভাব ছিল না পম্পেইবাসীর। কিন্তু এত সব নিয়ামতের মধ্যে ডুবে থেকেও পম্পেইবাসী ভুলে গেল মহান স্রষ্টাকে। ভুলে গেল তৎকালীন আসমানি ধর্মকে। উদাসীন হলো স্রষ্টার আরোপ করা বিধি-নিষেধের প্রতি। ফলে তারা লিপ্ত হলো নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপে। নিজেদের চিত্তরঞ্জনের জন্য উদ্ভাবন করল ঘৃণ্যতম সব পন্থা। খোদা প্রদত্ত নির্দেশাবলি অস্বীকার করে নানা ধরনের অমানবিক, হিংস্র আর নোংরা কর্মকাণ্ডে দিন দিন ডুবে যেতে থাকে পম্পেইবাসী।
নিছক বিনোদনের জন্য জনসমাগম করে, বিপুল জনতার সামনে তারা মানুষ ও পশুতে, কখনো বা মানুষে-মানুষে যুদ্ধ বাধিয়ে দিত। এই মানুষ ও পশু বা মানুষে-মানুষে একে অপরকে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আঘাত করে যতক্ষণ রক্তাক্ত করে কোনো একজনকে চিরতরে দুনিয়া থেকে বিদায় না করত, ততক্ষণ পর্যন্ত চলত এই বর্বরোচিত অমানবিক খেলা। আর এই মরণখেলা উপভোগ করত সে সময়ের রোমান অভিজাত শ্রেণির দর্শকরা। মানব হন্তারক সেজে সেখানে তারা খুঁজত চিত্তবিনোদন।
যৌনতায় ছিল এরা অন্ধ। শুধু যৌনকার্যের জন্য প্রতিটি বাড়িতে নির্মিত হতো আলাদা স্থাপনা। বাড়িঘরের দেয়ালে দেয়ালে অঙ্কিত হতো নগ্ন পর্ণচিত্র। নিজেরা তো যৌনতায় ডুবে থাকতই, সেই সঙ্গে নিজের ছেলে-মেয়েদের দিয়েও বণিক ও পর্যটকদের যৌন বিনোদনের ব্যবস্থা করতে তারা পিছপা হতো না। এমনকি তারা নিজেরা পশু-পাখির সঙ্গেও যৌন বিকৃতির পিপাসা মেটাত।
এভাবেই দিন দিন তৎকালীন আসমানি ধর্ম খ্রিস্টবাদ থেকে বিচ্যুত হতে থাকে তারা। ক্রমান্বয়ে শহর ছেড়ে চলে যেতে থাকেন সব ধর্মযাজকরা। ধর্মীয় চিন্তা-চেতনায় উজ্জীবিত ইউরোপের কনজারভেটিভ ধর্মীয় সম্প্রদায় পম্পেই শহর পরিভ্রমণ থেকে বিমুখ হতে শুরু করে। এমনই এক অমানবিক, ঘৃণ্যতম ও বর্বরোচিত সমাজব্যবস্থা যখন সেখানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, তখনই নেমে এলো মহান স্রষ্টার ক্রোধের আগুন। জীবন্ত মমিতে পরিণত হলো অনাচার আর পাপাচারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত থাকা মানুষগুলো।৭৪ খ্রিস্টাব্দের এক ভরদুপুর। আত্মহারা খোদাবিমুখ পম্পেই অধিবাসীরা আনন্দ-উল্লাসে
নিজেদের মত্ত রেখেছিল। এমনই সময়ে নেমে এলো খোদায়ি গজব। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী,
শহরের পাশে অবস্থিত ভিসুভিয়াস পর্বতের আগ্নেয়গিরিতে শুরু হয় বিরাট ধরনের অগ্ন্যুৎপাত,
যাতে পম্পেই শহরসহ শহরের দুই লাখ অধিবাসী দিনদুপুরে মাত্র অল্প কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে
অন্তত ৭৫ ফুট অগ্নির লাভা আর ছাইভস্মের নিচে বিলীন হয়ে যায়। তাত্ক্ষণিক জীবন্ত কবর
রচিত হয় শহরের সব মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদসম্ভারের। উল্লেখ্য, ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে আবারও
এই আগ্নেয়গিরিটি বিস্ফোরিত হয়েছিল, যাতে অন্তত ১৯ হাজার মানুষ নিহত হয়। কিন্তু সেটি
৭৪ খ্রিস্টাব্দের বিস্ফোরণের মতো ভয়াবহ ছিল না, যা টানা ১৯ ঘণ্টা পর্যন্ত অগ্নিবৃষ্টি
বর্ষণ করেছিল। আর ভূমধ্যসাগরের সাত মাইল ভেতর পর্যন্ত অগ্নি-লাভা ছড়িয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা
বলছেন যে তখন এর অগ্নি-লাভার তীব্রতা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের চেয়েও শক্তিশালী ছিল।
ওপরের দিকে অন্তত ৯ মিটার পর্যন্ত অগ্নস্ফুুুিলিঙ্গ ধাবিত হয়েছিল। এর পর থেকে অষ্টাদশ
শতাব্দী পর্যন্ত শত শত বছর ধরে আধুনিক মানবসভ্যতার অগোচরেই থেকে যায় এই অভিশপ্ত শহরটি।
কিন্তু ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে কিছু অ্যামেচার আর্কিওলজিস্ট সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন ধ্বংস
হয়ে যাওয়া পম্পেই নগরী। শুরু হয় রাষ্ট্রীয়ভাবে ধ্বংসলীলা থেকে মমি হয়ে থাকা মৃতদেহ
আর অভাবনীয় সব স্থাপনা উদ্ধারের মহাযজ্ঞ। আর ধীরে ধীরে সেখানে বাড়তে থাকে উত্সাহী জনতার
আনাগোনা। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, দুই হাজার বছরের পুরনো এই ধ্বংসলীলা থেকে এখনো অবিকৃত
অবস্থায় তাদের দেহগুলো পাওয়া যাচ্ছে। যে যেভাবে ছিল, অবিকল সেভাবেই পড়ে আছে। মহান স্রষ্টা
আগত প্রজন্মকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেওয়ার জন্য তাঁর নিদর্শন নৈপুণ্যতায় এসব মৃতদেহকে
বছরের পর বছর মাটির নিচে সযত্নে সংরক্ষণ করেছেন। কালের বিবর্তনে কয়েক হাজার বছরের পুরনো
সেই পর্যটনকেন্দ্র আবার পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু চির উন্নত সেই পম্পেই নগরী
ইতিহাসের অভিশপ্ত নগরী হয়ে মানুষের শিক্ষা গ্রহণের পাঠশালা হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। বর্তমানে
ইতালি সরকার বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এই নগরীকে ঐতিহাসিক জাদুঘরে রূপ দিচ্ছে। জাতিসংঘের
তথ্য অনুযায়ী, সেখানে বছরে প্রায় ২৫ মিলিয়ন পর্যটক ভ্রমণ করে।